অবৈধ স্বর্ণেই চলছিল আপন জুয়েলার্স

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

চোরাইপথে আনা স্বর্ণ ও হীরা দিয়েই চলছিল মেসার্স আপন জুয়েলার্সের বিভিন্ন শোরুম। শুধু তা-ই নয়, এসব চোরাই স্বর্ণ বিক্রির কোটি কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে পাচারও করেছে। ২০১৭ সালে রাজধানীতে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি শাখায় অভিযান চালিয়ে সাড়ে ১৩ মণ সোনা (৫৩৭ কেজি ৫০০ গ্রাম) ও ৭ হাজার ৭৪৩ পিস হীরার অলঙ্কার জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। স্বর্ণ জব্দের পর ওই বছরের ১২ আগস্ট গুলশান থানায় ২টি, ধানম-ি থানায় ১টি, রমনা থানায় ১টি ও উত্তরা পূর্ব থানায় ১টি মামলা করা হয়। মামলাগুলোর তদন্ত করতে গিয়েই আপন জুয়েলার্সের স্বর্ণ চোরাচালান ও অর্থপাচারের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য পান শুল্ক গোয়েন্দারা।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আপন জুয়েলার্সের বিভিন্ন শোরুম থেকে জব্দ করা সাড়ে ১৩ মণ সোনা ও পৌনে ৮ হাজার পিস হীরা প্রতিষ্ঠানটি অবৈধপথে এনেছিল। প্রতিষ্ঠানটি স্বর্ণ ব্যবসার আড়ালে দেশ থেকে ১৯০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করে; ফাঁকি দেওয়া হয় ২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার আয়কর। ওই ৫ শোরুমের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের মিল পাননি তদন্তকারীরা। স্বর্ণগুলোর বৈধ কোনো কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি আপন জুয়েলার্সের মালিকরা। অভিযোগের বিষয়ে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম

 

অবশ্য দাবি করেছেন তার সবকিছুই বৈধ। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, যেহেতু বিষয়টি তদন্তাধীন, সেহেতু এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না।

 

এদিকে দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি বছরের প্রথম দিকে দিলদার আহমেদ সেলিম এবং তার ভাই গুলজার আহমেদ ও আজাদ আহমেদের বিরুদ্ধে স্বর্ণ চোরাচালান ও অর্থপাচারের বিষয়ে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। আপন জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে ১৯০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের ওই পাঁচ মামলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে চার্জশিটের অনুমোদন চেয়েছে সংস্থাটি। এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে গত ১২ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত চিঠি দেয় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অনুমোদন পেলে শিগগিরিই আদালতে এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

 

আমদানি নীতিমালা হওয়ার পর ২০১৯ সালে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে অবৈধ সোনা বৈধ করার সুযোগ দেয় এনবিআর। জব্দ ও মজুদ থাকা অলঙ্কার বৈধ করতে এ সুযোগ তখন লুফে নিয়ে স্বর্ণ মেলায় আপন জুয়েলার্স প্রায় ১৪ কোটি টাকা কর দেয় বলেও জানা গেছে। চার্জশিটে উল্লিখিত তথ্যের বরাত দিয়ে এনবিআর সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে আপন জুয়েলার্সের মৌচাক মার্কেট শাখা থেকে জব্দ করা হয় ৫৪ কেজি ২৬৪ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার ও ১ হাজার ৫৮০ পিস হীরার অলঙ্কার। রমনা মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়। আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্ণধার দিলদার আহমেদকে। এসব স্বর্ণালঙ্কারের বিপরীতে পাচার করা হয় ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ফাঁকি দেওয়া হয় ৩ কোটি টাকা।

 

প্রায় একই সময়ে উত্তরা পূর্ব থানাধীন এনআর কমপ্লেক্সে (১ম তলা) আপন জুয়েলার্সের আরেকটি শোরুমে অভিযানকালে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ৮৯.৯ কেজি স্বর্ণালঙ্কার এবং ১০৩৫ পিস ও ৩৭৮ জোড়া হীরার অলঙ্কার জব্দ করেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এ ঘটনায় যে মামলা হয় তাতেও আসামি করা হয় দিলদার আহমেদকে। ওই সময় জানা যায়, অবৈধভাবে স্বর্ণ ও হীরার অলঙ্কার ক্রয় এবং আমদানি করা ছাড়াও আমদানিকৃত পণ্যের বিপরীতে ৩০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বিদেশে পাচার করেন দিলদার।

 

২০১৭ সালে ধানম্ডীর সীমান্ত স্কয়ারে আপন জুয়েলার্সের শোরুম থেকে জব্দ করা হয় ১০১ কেজি স্বর্ণ ও ১৫৫৭ পিস হীরার অলঙ্কার। এ বিষয়ে ধানমন্ডী থানায় যে মামলা হয় তাতেও আসামি দিলদার। বিপুল এ স্বর্ণের বিপরীতে একইভাবে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ৩৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ওই বছরেরই জুন মাসে গুলশান ১-এর সুবাস্তু ইমাম ফোয়ারে অবস্থিত আপন জুয়েলার্সের শোরুম থেকে ২০৩.৯০ কেজি স্বর্ণালঙ্কার এবং ২৮৫৯ পিস হীরার অলঙ্কার জব্দ করা হয়। এতে মামলায় আসামি করা হয় আহমেদকে।

 

নথি পর্যালোচনা করে গোয়েন্দারা দেখতে পান-আসামি গুলজার আহমেদ কর্তৃক ২০১৭-১৮ আয়কর বছরের জন্য দাখিলকৃত রিটার্নে প্রারম্ভিক জের হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৬৮ লাখ ২২ হাজার ৩৮০ টাকা। সে অনুযায়ী স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৪২৪ কেজি। ওই বছর স্বর্ণ ক্রয় হিসেবে দেখানো হয় ৬১ কোটি ৩১ লাখ ৪৫ হাজার ৬২৩ টাকা। এই হিসাব মতে স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫৫ দশমিক ৩ কেজি। পক্ষান্তরে বিক্রয় দেখানো হয় ২৪ কোটি ৭৩ লাখ ২৮ হাজার ৪০০ টাকা। স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ানোর কথা ৬২ দশমিক ৫৩৫ কেজি। ওই করবর্ষের সমাপনী জের হিসেবে প্রদর্শন করা হয় ৪৪ কোটি ২৬ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ টাকা। ওই হিসাবে স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১১ দশমিক ৯১৯ কেজি। অথচ আয়কর রিটার্নে সমাপনী জের হিসেবে দেখানো হয় ৫৭ কোটি ৪২ লাখ ৩১৩ টাকা। সে অনুযায়ী প্রায় ১১৭ দশমিক ৭৬০ কেজি স্বর্ণ হয়। এ ক্ষেত্রে ৫ দশমিক ৮৪১ কেজি স্বর্ণ ও এর মূল্য বেশি দেখানো হয়। যে মাসে অভিযান পরিচালনা করা হয়, সে মাসে ওই শোরুমে কোনো ধরনের ক্রয়-বিক্রয় হয়নি। ফলে কোনো ভ্যাট প্রদান করা হয়নি। অথচ ২০১৭ সালের জুনে আলোচ্য করবর্ষে শেষ মাস হওয়া সত্ত্বেও ওই কর বছরে সমাপনী জের হিসেবে প্রায় ১১৭ দশমিক ৭৬০ কেজি স্বর্ণের মূল্যমান ৪৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪২ হাজার ৩১৩ টাকা দেখানো হয়। ফলে বৈধভাবে অর্জিত অর্থের উৎসও গোপন করা হয়। এ মামলার অভিযোগপত্রে গুলজারের ভাই আজাদ আহমেদকেও অভিযুক্ত করা হচ্ছে।

 

ওই বছরের একই সময়ে গুলশান ১-এর ডিএনসিসি মার্কেটে আপন জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী আজাদ আহমেদের শোরুমে অভিযান চালিয়ে ৯০ দশমিক ৩৪৩ কেজি স্বর্ণালঙ্কার এবং ৩৩৮ পিস ডায়মন্ডের অলঙ্কার জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দারা, যার বিপরীতে বিদেশে পাচার করা হয় ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর কর ফাঁকি দেওয়া হয় ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। এ ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি এবং চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হচ্ছে আজাদ আহমেদকেও।

 

নথি পর্যালোচনা করে গোয়েন্দারা দেখতে পায়, ২০১৭-১৮ আয়কর বছরের জন্য আজাদ আহমেদের দাখিলকৃত রিটার্নে ওই বছরের প্রারম্ভিক জের হিসেবে দেখানো হয় ৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮১ হাজার ২৮০ টাকা। এই হিসাবে স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ দশমিক ১৯৭ কেজি। ওই বছর ক্রয় হিসেবে দেখানো হয় ৬৪ কোটি ৩৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৬২ টাকা। সে অনুযায়ী স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬২ দশমিক ৬৫৯ কেজি। পক্ষান্তরে বিক্রয় দেখানো হয়, ২৫ কোটি ৩৮ লাখ ২৭ হাজার ২০৫ টাকা। এ মূল্যে স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ১৭৮ কেজি। ওই করবর্ষের সমাপনী জের হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এই হিসাবে স্বর্ণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৮ দশমিক ৬৭৮ কেজি। অথচ আয়কর রিটার্নে সমাপনী জের হিসেবে ৫০ কোটি ৩০ লাখ ৯২ হাজার ৩১২ টাকা দেখানো হয়। এই হিসাবে প্রায় ১২৭ দশমিক ২০৪ কেজি স্বর্ণ হয়। এ ক্ষেত্রে ৮ দশমিক ৫২৬ কেজি স্বর্ণ ও তার মূল্য বেশি দেখানো হয়েছে। জব্দ করা থেকে পরবর্তী মাসেও কোনো ধরনের বিক্রয়তথ্য প্রদর্শন করা না হলেও আটকের তারিখ অন্তর্ভুক্ত আয়কর বছরের সমাপনী জেরে ১২৭ দশমিক ২০৪ কেজি স্বর্ণের সমপরিমাণ মূল্য হিসেবে ৫০ কোটি ৩০ লাখ ৯২ হাজার ৩১২ টাকা ফের পরবর্তী কর বছরের প্রারম্ভিক জের হিসেবে ৪৭ দশমিক ৮৯১ কেজি স্বর্ণের সমপরিমাণ মূল্য হিসেবে ১৮ কোটি ৯৪ লাখ ১২ হাজার ৬৪৮ টাকা প্রদর্শন করে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের উৎস গোপন করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023