জয়পুরহাট প্রতিনিধি
জয়পুরহাট চিনিকল ১৯৬১ সালে ২৮শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার শিল্প উন্নয়ন সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ১৮৮.৮৭ একর জমি অধিগ্রহন করে এই চিনিকল নির্মানের কাজ শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে ১১ই ফেব্রæয়ারী নির্মান কাজ শেষ হলে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ না করেই চিনি উৎপাদন শুরু করে চিনিকল কর্তৃপক্ষ। সেই থেকেই এর বর্জ্যে দূষণ ঘটছে এলাকার পরিবেশ। এরই মধ্যে সুগারমিলে শিল্প মন্ত্রণালয় এর অধীনে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন বাস্তবায়নে বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) প্রকল্প ২০১৮ সালের ১ জুলাই উদ্বোধন হয়ে ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা, আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও একমাত্র নালা ও ঘর তৈরী ছাড়া প্রকল্পের কাজের কোন অগ্রগতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয়দের মনে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর রয়েছে পাঁচ মাস, আদোও হবে কি বর্জ্য শোধনাগার নাকি অধরাই থেকে যাবে।
জয়পুরহাট চিনিকল থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য একটি নর্দমার মাধ্যমে নিঃসৃত পানি অপসারন করা হয় আক্কেলপুর উপজেলার রুকিন্দীপুর ইউনিয়নের আওয়ালগাড়ি গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্রীখাল ও পৌর সদরের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া তুলশীগঙ্গা নদীতে। এই কারনেই খাল ও নদীর পানির রং কালচে আকার ধারণ করেছে এবং ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ছে, পাশাপাশি পানির দুর্গন্ধে চরম অসুবিধায় পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বসবাস করা নদী এলাকার সংশ্লিষ্ট মানুষরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জামালগঞ্জ পাঁচ মাথা থেকে তুলসীগঙ্গা নদী পর্যন্ত এবং আক্কেলপুর পৌর শহরের সোনামুখী সেতুর দক্ষিণ পাশের অংশে থেকে শুরু করে তুলসীগঙ্গা নদীর পানি কালচে রং ধারণ করেছে। শ্রী খালটি এসে সোনামুখী সেতুর কাছে এসে মিলিত হয়েছে। আর সেতুর উত্তর থেকে দক্ষিণে পানির স্রোত রয়েছে। তবে সেতুর উত্তরে তুলসীগঙ্গা নদীর পানি ভালোই রয়েছে। বর্তমানে সেতুর দক্ষিণ পাশ থেকে হলহলিয়া রেলসেতু পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার নদীপথের পানি কালচে রং হয়ে রয়েছে। পানি থেকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে সেচকাজ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ২০ দিন আগেও শ্রী খাল ও নদীর পানি পরিষ্কার ছিল তখন তাঁরা এই নদীর পানি ব্যবহার করতে পারতেন।
শ্রী খাল ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা জানান, জয়পুরহাট চিনিকলে আখমাড়াই কার্যক্রম চলছে। চিনিকলের বর্জ্যে শ্রী খাল ও তুলসীগঙ্গা নদীর পানি দূষিত হয়েছে। দিনের বেলা ওই নদীর পানি থেকে খাল ও নদীর পানি থেকে দূর্গন্ধ কিছুটা কম হলেও রাতে বেলা দূর্গন্ধ বেড়ে যায়। এতে শ্রী খাল ও নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের বসবাস দূর্বীসহ্য হয়ে উঠেছে। সেই সাথে তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। আওয়ালগাড়ি গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্রী খালের দু’পাশ দিয়ে রয়েছে কৃষি জমির (ভিটে মাটি) আবাদ। আর এসব জমিতে পানি সেচ দেওয়া হয় ওই খাল থেকেই। প্রায় ২০-২৫ দিন ধরে ওই এলাকার কৃষকেরা কোনো কাজেই শ্রী খাল ও নদীর পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। দূষিত পানিতে শ্রী খালের সমস্থ মাছ ও জলজপ্রাণি মারা গেছে। সেই সাথে তুলসীগঙ্গা নদীর মাছও মরে যাচ্ছে। এর আগেও চিনিকলের বর্জ্যে তুলসীগঙ্গা নদীর পানি দূষিত হয়েছিল।
আওয়ালগাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল বাসেদ বলেন, ‘শ্রী খালের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতাম। খালের পানি কালচে হওয়ায় জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না।’ পানির অভাবে আমার সবজি ক্ষেতের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জয়নাল বলেন, শ্রী খালের পানি কালচে রং হয়েছে। ওই পানি থেকে এতোটাই দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে যে সন্ধ্যার পরে বাড়িতে থাকায় দূর্বীসহ হয়ে পড়েছে। এটি কয়েক বছর ধরে হয়ে আসছে। শ্রী খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি (পাবসস) লিমিটেড এর সভাপতি আবু মোতালেব বলেন, জয়পুরহাট চিনি কলের দূষিত বর্জ্য পানি শ্রী খালে আসায় আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে খালে ছেড়ে দেওয়া সমস্থ মাছ মারা যায়। এবং খালের পানি এলাকার কোন কৃষক ব্যবহার করতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষর কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরেও কোন কাজ আজ পর্যন্ত হয় নি।
আক্কলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, কিছু দিন আগেও শ্রী খাল ও তুলসীগঙ্গা নদীর পানি ভালো ছিল। খাল ও নদীপাড় এলাকার অনেক কৃষক এ পানি সেচকাজে ব্যবহার করতেন। জয়পুরহাট চিনিকলের পানিতে শ্রী খাল ও তুলসীগঙ্গা নদীর পানি সেচকাজে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আর ওই পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করা যাবে না।
জয়পুরহাট চিনিকলের বর্জ্য মিশ্রিত অপরিশোধিত পানি তুলশীগঙ্গা নদীর পানিতে মিশে গিয়ে পরিবেশ দুষন করছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে এ অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল (সোমবার) নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সন্মেলন করে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আনোয়ার হোসেন আকন্দ।
চিনিকল ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাংবাদিকদের জানান, পরিবেশ দূষণের জন্য চিনিকলের অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসৃত পানি এককভাবে দায়ী,এমন অভিযোগ সঠিক নয়। পানি শোধনাগার নির্মাণ না হলেও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে বর্জ্যসহ পানি চিনিকলের নিজস্ব ক্যানেলে নেওয়া হচ্ছে। তবে যন্ত্রপাতি ধোয়ার স্প্রে করা পানি শুধু বের করে দেওয়া হয়, সেগুলোই কেবল জেলার বিভিন্ন ড্রেন ও খাল বেয়ে নদীতে পরছে, তবে সেগুলো পরিবেশের জন্য কোন ক্ষতির কারন নয়।
তিনি আরো বলেন, জয়পুরহাট চিনিকল ছাড়াও জেলায় কয়েক হাজার চালকল ও মুরগী খামার রয়েছে, যেগুলো থেকে ব্যবহার অনুপযোগী পানি বের হয়ে তুলশী গঙ্গার পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। এতে করে পরিবেশ দুষন হলেও শুধু একক ভাবে চিনিকলকে দায়ী করা দুঃখজনক।
তারপরও যেটুকু পানি নিসৃত হয়ে নদীতে পরছে, তা আগামী বছরে চিনিকল এলাকায় শোধনাগার নির্মান হলে এক ফোটা পানিও বাইরে যাবে না বলে আশ^স্ত করেন চিনিকলের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। এদিকে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, প্রশাসনের রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তা ও বগুড়ার পরিবেশ অধিদপ্তর তত্বাবধানে তদন্ত করে একটি রিপোর্ট আমাকে দিয়েছে, তদন্ত রিপোর্টে পানি দূষণ চিনিকলের বর্জ্যের মাধ্যমে হচ্ছে বলে তারা অবহিত করেন, এর প্রেক্ষিতে বর্জ্য পানিতে ফেলতে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্পের জন্য চুরাশি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে,কিছু টাকা তারা পেয়েছে,এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যা থাকবে না বলেও তিনি জানান।