আলু ক্ষেতে ‘লেট ব্লাইট’ রোগ, দিশেহারা কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর

দিনাজপুর, নীলফামারী ও জয়পুরহাটের আলু ক্ষেত ‘লেট ব্লাইট’ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এতে আলু গাছ পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বারবার বালাইনাশক স্প্রে করেও তেমন ফল না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন কৃষকরা। জেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচণ্ড শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে এই রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। রোগ প্রতিকারে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তারা। আমাদের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

দিনাজপুর

দিনাজপুরে এ বছর প্রায় ৪৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে; যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার হেক্টর বেশি। তবে আবাদি জমির পরিমাণ বাড়লেও প্রচণ্ড শীত ও ঘন কুয়াশায় আলুর ক্ষেতে দেখা দিয়েছে ‘লেট ব্লাইট’ রোগ। এই রোগের আক্রমণে পাচে যাচ্ছে আলুর পাতা ও কাণ্ড।

কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও সেভাবে পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই ভরসা কীটনাশক দোকানদারদের ওপর। তবে স্প্রে করেও তেমন ফল মিলছে না। এতে করে আলুর ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মালঝাড় এলাকার কৃষক মোকসেদ আলী বলেন, ‘আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছি। তিন দিন পরপর ওষুধ দিছি, কিন্তু কোনও কাজ হয় না। প্রতিদিন নতুন নতুন জমি আক্রান্ত হচ্ছে। আলু গাছের শুধু কাণ্ড পড়ে আছে, পাতা-আগা কিছুই নেই।’

বিরল উপজেলার মালঝাড় এলাকার কৃষক ওয়াজেদ আলী বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ করেই ক্ষেতে এই রোগের আক্রমণ হয়েছে। ওষুধ স্প্রে করেও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। আবাদ মারা গেলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কীভাবে চলবো, ভাবলে দিশেহারা হয়ে পড়ি।’

কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় আলু গাছ ঝলসে গেছে।’ এই অবস্থায় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন সবুজার রহমান নমে আরেক কৃষক।

তবে কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি আক্রান্ত ক্ষেতে ওষুধ স্প্রে করাসহ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। বিরল উপজেলার ফারাক্কা বাঁধ ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত শীত ও কুয়াশার কারণে লেট ব্লাইট রোগের আক্রমণ হয়েছে। আক্রান্ত ফসলে ম্যানকোজেব গ্রুপের ওষুধ স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ওষুধ স্প্রে করায় রোগের আক্রমণ কিছুটা কমেছে।’ দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ তৌহিদুল ইকবাল বলেন, ‘আক্রান্ত রোগ দমনের জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেসব জাতে লেট ব্লাইট কম হয় সেসব জাত ব্যবহারের জন্যও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সঠিক পরিমাণে ওষুধ স্প্রে করার জন্যও বলা হচ্ছে। কৃষকদের লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। দলীয় বৈঠকেও বিষয়গুলো নিয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী দমন ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও জানান তিনি।

জয়পুরহাট

বিরূপ আবহাওয়ায় আলু ক্ষেত নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটছে জয়পুরহাটের কৃষকদের। বারবার কীটনাশক স্প্রে করেও শঙ্কা কাটছে না তাদের। তবে কৃষি বিভাগের দাবি, আবহাওয়া ভালো হয়ে গেলে ফসল নিয়ে শঙ্কা কেটে যাবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ বছর আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩৭ হাজার ৯১৭ হেক্টর। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় আলু চাষ হয় ৩৮ হাজার ৩২৫ হেক্টর জমিতে। তবে টানা শৈত্য প্রবাহ, কুয়াশা ও মাঝে মাঝে বৃষ্টির কারণে আলু ক্ষেত নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে কৃষকদের। কুয়াশার পাশাপাশি বৃষ্টিতে আলু গাছে নাভিধসা রোগের আক্রমণ হতে পারে এমন আশঙ্কায় বার বার ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন কৃষকরা।

কৃষকরা জানান, আলু গাছ রক্ষায় তারা সার্বক্ষণিক পরিচর্যা করছেন। বারবার ছত্রাকনাশক স্প্রে করছেন। কিন্তু কুয়াশা ও বৃষ্টির কারণে গাছ পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে। ফলে পরের দিন আবারও স্প্রে করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ তিন থেকে চার বার ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছেন জমিতে। দিনের বেলায় মাঠের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, আলু ক্ষেত নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষকরা।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার সরদার পাড়া গ্রামের কৃষক ওয়াদুদ সরদার বলেন, ‘লাভের আশায় বিঘাপ্রতি ১৫ হাজার টাকা খরচ করে প্রায় ৩৫ দিন আগে পাঁচ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণ করেছি। আলু গাছও খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহ থেকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আলু ক্ষেত নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। এ পর্যন্ত দুই হাজার টাকা খরচ করে ক্ষেতে দু’বার ছত্রাকনাশক স্প্রে করেছি। জানি না ভাগ্যে কী আছে।’

একই গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘ক্ষেতে এখনও রোগ দেখা দেয়নি। তবে রোগ ধরলে ফসল বাঁচানোর সুযোগ থাকে না। এ ধরনের আবহাওয়ায় আলু ক্ষেতে সাধারণত নাভিধসা রোগ হয়।’ তিনি বলেন,‘সাড়ে তিন বিঘা জমিতে প্যাকরি ও অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণ করতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা।’

আলু ক্ষেত স্প্রে করছেন কৃষক

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা বাবলু কুমার সূত্রধর বলেন,‘শীতের কারণে আলু ক্ষেতের ক্ষতির আশঙ্কায় কৃষকরা শঙ্কিত হলেও এখন পর্যন্ত ফসল ভালো আছে। বৈরী এই আবহাওয়ার মধ্যে কৃষকদের করণীয় বিষয়ে লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি নানা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আশা করি, আবহাওয়ার বৈরীভাব কেটে গেলে জেলায় এবার আলুর বাম্পার ফলন হবে।’

নীলফামারী

বৈরী আবহাওয়ায় আলুসহ উঠতি সবজির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, ‘লেট ব্লাইট’ ও ‘আরলি ব্লাইট’ রোগে আক্রান্ত হয়ে আলু গাছের পাতা কুঁকড়ে যাচ্ছে। মরে যাচ্ছে আলুর কচি পাতা ও ডগা।

জেলা সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, ‘এবার লাভের আশায় দেড় বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। কিন্ত বৈরী আবহাওয়ায় ক্ষেতের আলুর পাতা ও ডগা মরে যাচ্ছে। এই আবহাওয়া চলতে থাকলে আলু চাষ করে লাভ তো দূরের কথা বীজের টাকাও উঠবে না।’

সদর উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পাপিয়া বেগম বলেন, ‘লেট ব্লাইট (ধীরে পচে) ও আরলি ব্লাইট (দ্রুত পচে) রোগে আলুর পচন শুরু হয়। আমরা মাঠ পর্যায়ে চাষিদের ক্ষেতের রোগ নিরাময়ের জন্য নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়াও ম্যানকোজেব ও কার্বনডাজিম নামের ওষুধ এক সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে শীত ও ঠান্ডাজনিত রোগে ভালো ফল পাওয়া যায়।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023