মুক্তজমিন ডিজিটাল রিপোর্ট:কয়েক বছর ধরেই চাপে রয়েছে অর্থনীতি। এর মধ্যে গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। হাসিনার পালানো ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ে কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা আসলেও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে একেবারেই ধীরগতি। নতুন বিনিয়োগ বন্ধ, পুরনো বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা দেশের অর্থনৈতিক গতি রুদ্ধ করছে। এতে করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম উৎকণ্ঠায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। সরকার কোন কিছুই ঠিক করতে পারছে না। এর অন্যতম কারণ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। হাসিনা ভারতে পলায়নের পর প্রায় এক বছর পূর্ণ হতে চললেও অর্থনীতির গতি ফেরেনি, বিদেশিরা নতুন বিনিয়োগ করেনি।
ঢাকঢোল পিটিয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন করা হলেও বিদেশিরা জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না। নির্বাচিত সরকার এলেই তারা নতুন নতুন বিনিয়োগ করবেন। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সংকট, রফতানি হ্রাস এবং রাজস্ব ঘাটতিতে অর্থনীতি এখনও নানা অনিশ্চয়তায় ঘেরা। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে পাল্টা শুল্ক, ভারতের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা রফতানির ওপর চাপ তৈরি করেছে। আখাউড়া স্থলবন্দরের মতো কিছু সীমান্ত বাণিজ্য পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যেখানে রফতানি ৪০ শতাংশ কমে গেছে। গত পাঁচ দিনে লোকসান হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। আর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ প্রায় ১০০টি পণ্যে আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের চিন্তা করছে।
এদিকে রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার অন্যতম মাধ্যম চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম নেই। আমদানি-রফতানি বন্ধ প্রায়। চীন থেকে ১৪ দিনে চট্টগ্রাম বন্দরে কাঁচামাল আসছে কিন্তু ঢাকায় পণ্য আসতে লাগছে ১৮ দিন। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত কেন্দ্র করে রাজস্ব প্রশাসনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরে অচলাবস্থা নেমেছে, মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সার্বিক রাজস্ব আয় কার্যক্রম। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ডাকে গত সপ্তাহ থেকে কলমবিরতি কর্মসূচি পালন করছেন কর্মকর্তারা। এতে আমদানি-রফতানি কার্যক্রমে বিপর্যস্ত। গতকাল শনিবার থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে ঐক্য পরিষদ। সবকিছু যেন হ-য-ব-র-ল।
এমনকি বৈশ্বিক ঋণমান নির্ণয়কারী সংস্থা ফিচ রেটিংয়ের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস নেতিবাচক হিসেবেই বহাল থাকছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ঋণমান নির্ণয়কারী আরো দুই বড় প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এবং মুডিস ইনভেস্টর সার্ভিসও বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন থেকে ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে ‘নতুন ঋণ’ চাহিদা নেই। অধিকাংশ ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলো নিয়ে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের অমূলক বক্তব্যে বিপাকে রয়েছে এক ডজন ব্যাংক। ব্যাংক মালিকদের বাদ দিয়ে বাইরে থেকে লোক বসিয়ে ব্যাংকগুলোকে আরো দুর্বল করা হয়েছে। ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান বা ‘ড্যাপ’ বাস্তবায়নের নামে আবাসন খাতে ধস নামানো হয়েছে। জমি বিক্রি নেই, মানুষের হাত খালি, অর্থের প্রবাহ নেই। ছোট ছোট মুদি দোকান পর্যন্ত বন্ধ করে দিচ্ছে দোকানীরা। মোট কথা ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতাবস্থা চলছে।
অপরদিকে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। ইতোমধ্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছি। অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড়াও নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব আয় কম, চাপ সুদ পরিশোধ
চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা কম। দেশি-বিদেশি উৎসে এখন সরকারের মোট ঋণ প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ কোটি টাকা। নতুন বাজেট বাস্তবায়ন করতে দেশি ও বিদেশি মিলে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই সরকারের ব্যয় প্রস্তাব করা হচ্ছে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত ব্যয় আরও বেশি হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।
ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা
বিভিন্ন শিল্প গ্রুপ, মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তাদেরও ব্যবসা-বাণিজ্যে অচলাবস্থা নেমেছে। ব্যবসায়ীদের এলসি নেই বললেই চলে। অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছেন। মুদি দোকান-ফুটপাতে বেচাকেনা নেই। ব্যবসা না থাকায় মানুষের মধ্যে অর্থের প্রবাহও নেই। দেশে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ডলার সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহারের প্রভাব নতুন বছরেও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই দুরবস্থার প্রভাব রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসা পর্যন্ত চলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্র-জনতার বিপ্লবে স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মকা-ে স্থবিরতা নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ও বিনিয়োগে মন্দার রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। আর এর মধ্যেই ‘সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ’ করার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। শ্রম উপদেষ্টার এ বক্তব্যে দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য অশনিসঙ্কেতও।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমই’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন বিনিয়োগ দূরের কথা, টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত ব্যবসায়ীসমাজ। যখন ব্যাংকের সুদহার বেড়ে যায় তখন সব হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়। কারণ কিস্তির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং মুনাফার হার কমে আসে। অর্থনীতিতে গতি আনতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার বলে মনে করেন তিনি। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শ্রমিকদের পাওনাদি দ্রুত পরিশোধে শ্রম উপদেষ্টার বক্তব্য ব্যবসায়ীদের জন্য অশনিসঙ্কেত।
এই বার্তা শিল্পের জন্য খুবই খারাপ হয়েছে। একজন ব্যবসায়ী জীবন-যৌবন, শ্রম, আয়-রোজগার সবকিছু দিয়েই একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আর তা বিক্রি করে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট দিতে হবে, এটা দুর্ভাগ্যজনক। বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা চলছে। আগামীর রাজনীতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে চিন্তায় আছেন ব্যবসায়ীরা। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনতে হবে।( সূত্র-দৈনিক ইনকিলাব )।