কুড়িগ্রামে খাবারের সন্ধানে পানি ভেঙে ছুটছেন বানভাসিরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মুক্তজমিন ডেস্ক

‘দশ দিন ধইরা ঘরেও পানি, বাইরেও পানি। কোলের ছইল (বাচ্চা) নিয়া ভরা পানিতে কোনও দিক যাইতে পারি না। খাইয়া না খাইয়া দিন কাটতাছে, কেউ কোনও সাহায্য দিবার আইলো না। মেম্বার চেয়ারম্যান দেখপারও আহে নাই। আমাগো কষ্ট কে বুঝবো!’ সংবাদকর্মীদের নৌকাকে খাদ্যসামগ্রীর নৌকা ভেবে দেড় বছরের শিশুসন্তান রূপামণিকে কোলে নিয়ে কোমর সমান উচ্চতার পানি ভেঙে নৌকার দিকে ছুটে আসেন মনোয়ারা বেগম। কাছে এসে যখন বুঝলেন ত্রাণ সহায়তা নয়, এটি সংবাদকর্মীদের নৌকা তখন এভাবেই নিজেদের ভোগান্তি আর অসহায়ত্বের বর্ণনা দেন মনোয়ারা। একে একে জড়ো হন আরও বানভাসি নারী-পুরুষ। কেউ ডিঙি নৌকায়, কেউবা পানি ভেঙে। বেশির ভাগের কোলে শিশু সন্তান। মায়েরা যখন ভোগান্তির গল্প শোনান, কোলের শিশুরা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তাদের দৃষ্টিতে ক্ষুধা নাকি তিরস্কারের ভাষা তা ঠিক স্পষ্ট নয়। শুক্রবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র বেষ্টিত প্রত্যন্ত গ্রাম বালাডোবার চিত্র এটি। পানিবন্দি এই পরিবারগুলোর কষ্ট আর বিড়ম্বনা অবর্ণনীয়। ১০-১২ দিন যাবৎ পানিবন্দি থাকলেও খাদ্য সহায়তার ছিটেফোঁটাও জোটেনি তাদের ভাগ্যে।

বালাডোবার জুলেখা বেগম, নূরজাহান, হাজেরা বেগম সবার মুখেই খাদ্যসহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপ। ঘোলা পানিতে বসবাস করা বিচ্ছিন্ন দ্বীপচরের এই বাসিন্দারা রাষ্ট্রের নিবন্ধিত নাগরিক হলেও অন্য সবার মতো রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা তারা পান না। জীবনযাপনে কষ্ট আর বিড়ম্বনা তাদের নিত্যসঙ্গী। এমনটাই জানা গেলো ভুক্তভোগীদের ভাষ্যে।

এই গ্রামের হাজেরা বেগম বলেন, ’১০-১২ দিন ধইরা পানিত আছি। বাজারঘাট করারও ব্যবস্থা নাই। ইয়ার উয়ার কাছত (এর ওর কাছে) ধার কইরা কোনও মতে খাই। একবেলা খাইলে আর একবেলা জোটে না। এতো কষ্টের পরও না পাইলাম সাহায্য, না পাইলাম মেম্বার-চেয়ারম্যানগো দেখা। বালবাচ্চা নিয়া কেমনে আছি আপনাগো বোঝান যাইবো না।’

বালাডোবা গ্রাম পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের তীব্র ঢেউ ভেঙে নৌকা এগিয়ে যায় আরও পূর্বে, মশালের চর গ্রামে। দূর থেকে মনে হয় কোনও কাশবনের দিকে নৌকা এগিয়ে চলছে। প্রায় ত্রিশ মিনিট পর নদের সীমা পেরিয়ে মশালের চরের প্লাবিত লোকালয়ে যখন নৌকা প্রবেশ করলো, সেখানেও দেখা মিললো পানিবন্দি পরিবারের বসবাস। মশালের চরের বাড়িঘরগুলো পানিবন্দি হলেও এখানে পানির উচ্চতা তুলনামূলক কম। গ্রামটির কিছুটা উত্তরে বেশ কিছু বাড়িঘরে এখনও পানি। নৌকায় বসবাস করছেন বাড়িগুলোর নারী ও শিশুরা। কেউবা ঘরের ভেতর বিছানায় বসে পানি নেমে যাওয়ার প্রহর গুনছেন। চারণভূমি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় গবাদি পশুগুলো রাখা হয়েছে সমতল থেকে অনেক উঁচুতে। সেখানেই খড় মুখে জাবর কাটছে প্রাণিগুলো।

গ্রামের শেষ প্রান্তে নৌকায় নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসে আছেন রূপবানু। স্বামীহারা মধ্যবয়সী এই নারীর সংসারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার একমাত্র ছেলে। ঘরের ভেতর পানি। পানিতে ডুবেছে টিউবয়েল, শৌচাগার। দুই সপ্তাহ ধরে নৌকা আর ঘর, এই তাদের পৃথিবী।

রূপবানু জানালেন, প্রায় তিনশ’ পরিবার নিয়ে তাদের এই গ্রাম। ওই গ্রামেই থাকেন ৯নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য সিদ্দিক। কিন্তু পানিবন্দি দশার দুই সপ্তাহের একদিনও তারা সিদ্দিকের দেখা পাননি। কেউ তাদের খোঁজ নিতেও আসেনি। মেলেনি কোনও খাদ্য সহায়তা।

রূপবানুর বাড়ির পাশেই আর এক পানিবন্দি পরিবার। ওই বাড়ির কর্তা মতিয়ার রহমান। নৌকায় করে গবাদিপশুর জন্য কাচা কাশ কেটে নিয়ে এসেছেন। সেগুলো মজুত করার পর ওই নৌকাতে চুলা নিয়ে রান্না করছেন তার স্ত্রী।

মতিয়ার জানান, নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে এখন অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। বন্যার পানি প্রবেশ করায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তাদের। হাতে কাজ না থাকায় রুজির জোগান দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পেলে তাদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো। কিন্তু নিরুপায় এই শ্রমজীবীরা কোনও খাদ্য সহায়তা পাননি।

বানভাসিদের অভিযোগের সত্যতা মেলে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেনের ভাষ্যে। তিনি জানান, ৫ টন চাল বরাদ্দ পেলেও তা বিতরণ শুরু করা সম্ভব হয়নি। তার ইউনিয়নে বন্যা দুর্গতদের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে নদীভাঙন। কিন্তু কোনও সাহায্য সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। চেয়ারম্যান বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) রাতে ডিও হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। এখনও চাল উত্তোলন করিনি। এর মধ্যে উপজেলা চেয়ারম্যান জানিয়েছেন তারা এসে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করবেন।’

এতে করে বানভাসিদের হাতে সহায়তা পৌঁছানো আরও বিলম্বিত হচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘তা তো হবেই। তারা (উপজেলা চেয়ারম্যান) নিজেদের শিডিউল অনুযায়ী এসে ত্রাণ বিতরণ করবেন। এতে বিলম্ব হবে এটাই স্বাভাবিক।’

তবে খাদ্য সহায়তা বিতরণে বিলম্বের কোনও কারণ দেখছেন না জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। বরাদ্দ দেওয়ার পরও বিতরণে বিলম্বের খবরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজও (শুক্রবার) কয়েকটি ইউনিয়নে বানভাসিদের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। খাদ্য বিতরণে বিলম্ব মেনে নেওয়া হবে না। আমি চেয়ারম্যানকে বলে দিচ্ছি যেন আগামীকালই ওই এলাকায় খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজনে আমি ম্যাজিস্ট্রেট পাঠাবো।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023