সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফারহান হক জানান, সব অঞ্চলের কর্তৃপক্ষকেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের উত্থাপিত আগের উদ্বেগগুলোর কথা উল্লেখ করে ফারহান হক বলেন, ‘মহাসচিব তার হাইকমিশনারের বক্তব্যকে সমর্থন করেন এবং আমরা অবশ্যই আশা করি যে, মিস্টার তুর্কের আহ্বানগুলো গুরুত্ব সহকারে শোনা হবে।’শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নেওয়া পদক্ষেপের ওপর জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট দাবির প্রেক্ষিতে ফারহান হক জোর দিয়ে বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর যেকোনো আঘাত বা ক্ষতির ঘটনা অবশ্যই তদন্ত করতে হবে।
ফারহান হক আরো বলেন, ‘সব জায়গার সব কর্তৃপক্ষের জন্যই এটি গুরুত্বপূর্ণ যে তারা যেন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ দেয় এবং অবশ্যই এই ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য।যদি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
গত ১৭ জুলাই বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে পাকিস্তানের কাশ্মীরে বাড়তে থাকা সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। তিনি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষকে সংযম প্রদর্শন করতে, মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে এবং সহিংসতার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
বিবৃতিতে তুর্ক অঞ্চলজুড়ে ক্রমাগত বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।হাইকমিশনার নথিভুক্ত সমস্ত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত, পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ভুক্তভোগীরা বিক্ষোভকারী কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য যেই হোক না কেন, এই মৃত্যুর জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বিক্ষোভ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ‘জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেকেজেএএসি)-কে নিষিদ্ধ করার পাকিস্তানি সিদ্ধান্তের বিষয়েও তুর্ক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে হাইকমিশনার বলেন, আটককৃত জেকেজেএএসি নেতাদের অবিলম্বে আইনজীবী এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকারকে পুরোপুরি সম্মান জানাতে হবে।
এদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পাকিস্তানের কাশ্মিরে চলমান সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত বুধবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বর্তমানে পাকিস্তানের কাশ্মীরে মৌলিক অধিকারের নির্মম দমনপীড়ন প্রত্যক্ষ করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা গেছে যে, স্থানীয় জনগণের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ অধিকার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী মারাত্মক সহিংসতা, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার আশ্রয় নিয়েছে। নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো এই সহিংসতা পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকদের চরম ভন্ডামিকে প্রকাশ করে দেয়।জয়সওয়াল আরো বলেন, চিরাচরিত কূটনৈতিক নাটক করার পরিবর্তে পাকিস্তানের উচিত হবে কাশ্মিরে রক্তপাত বন্ধ করা। তাদের নিজেদের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য, যাচাইযোগ্য ও অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এবং তাদের বেআইনি ও জোরপূর্বক দখলে থাকা সমস্ত ভারতীয় ভূখণ্ড অবিলম্বে খালি করা। বিশ্ববাসী এই সাজানো নাটকে বিভ্রান্ত হচ্ছে না।
অরাজনৈতিক সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির নেতৃত্বে গত ৫ জুন থেকে ৩৮ দফা দাবিতে কাশ্মীরে আন্দোলন হচ্ছে। মূলত মুদ্রাস্ফীতি, লোডশেডিং, আটার ঘাটতি এবং কয়েক দশকের সামরিক দমনপীড়ন, নিপীড়ন, বৈষম্য ও অত্যাচার থেকে সৃষ্ট পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই এবারের আন্দোলন। তবে এবার ৩৮ দফার মূল দাবি হলো সংসদে কাশ্মীরের বাইরে থাকা কাশ্মিরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই সংরক্ষিত আসন দিয়েই ইসলামাবাদ বরাবর কাশ্মীরের ওপর নিজের ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পায়। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই ইসলামাবাদ আলোচনার বদলে নিষ্ঠুরতাকে হাতিয়ার করে। আন্দোলনকারীদের পিছু হটাতে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতির পাশাপাশি অঞ্চলটিতে খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ করে দেওয়ায় ফলে ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসমূহ অচল হয়ে পড়েছে। এছাড়া গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কারফিউ জারি করে সরকার কাশ্মীরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।
চলমান সহিংসতায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অবশ্য আন্দোলনকারীদের দাবি, মৃতের সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
সূত্র : এএনআই