এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ৯২টির মাধ্যমে পূর্ববর্তী আইন সংশোধন করা হয়। একই আইনে একাধিকবার সংশোধনী আনতে একাধিক অধ্যাদেশের নজিরও আছে। যেমন—আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে একাধিকবার সংশোধনী এনে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে সংশোধনী সংক্রান্ত একাধিক অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। পূর্ববর্তী আইন রহিত করতে জারি করা হয়েছে তিনটি অধ্যাদেশ। আর নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে জারি করা হয়েছে ৩৮টি অধ্যাদেশ। যার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মতো বিষয় রয়েছে।সংবিধানে যা বলা হয়েছে
সংসদের অধিবেশন না থাকলে বা সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে এই অধ্যাদেশে জারির ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পাস হতে হবে। না হয় অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে লোপ পাবে অধ্যাদেশের কার্যকারিতা।
এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৯৩। (১) [সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত] কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।
তবে রাষ্ট্রপতির এই অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা অবারিত নয়। এই অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার অধীন কোনো অধ্যাদেশে এমন কোনো বিধান করা হইবে না, (ক) যাহা এই সংবিধানের অধীন সংসদের আইন-দ্বারা আইনসঙ্গতভাবে করা যায় না; (খ) যাহাতে এই সংবিধানের কোন বিধান পরিবর্তিত বা রহিত হইয়া যায়; অথবা (গ) যাহার দ্বারা পূর্বে প্রণীত কোন অধ্যাদেশের যে কোন বিধানকে অব্যাহতভাবে বলবৎ করা যায়।
অধ্যাদেশ সংসদে গৃহীত হওয়ার বিধান সম্পর্কে এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, (২) এই অনুচ্ছেদের (১) দফার অধীন প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে তাহা উপস্থাপিত হইবে এবং ইতঃপূর্বে বাতিল না হইয়া থাকিলে অধ্যাদেশটি অনুরূপভাবে উপস্থাপনের পর ত্রিশ দিন অতিবাহিত হইলে কিংবা অনুরূপ মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার পূর্বে তাহা অননুমোদন করিয়া সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হইলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পাইবে। (৩) সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থার কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট ব্যবস্থা-গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি এমন অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন, যাহাতে সংবিধান-দ্বারা সংযুক্ত তহবিলের ওপর কোন ব্যয় দায়যুক্ত হউক বা না হউক, উক্ত তহবিল হইতে সেইরূপ ব্যয়নির্বাহের কর্তৃত্ব প্রদান করা যাইবে এবং অনুরূপভাবে প্রণীত কোন অধ্যাদেশ জারি হইবার সময় হইতে তাহা সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে। (৪) এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারীকৃত প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ত্রিশ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদ সমূহের বিধানাবলী প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।
সরকার যা বলছে
১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সেই অধিবেশনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে। এ বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবিধানিকভাবে যতগুলো অধ্যাদেশ হয়েছে, প্রত্যেকটা অধ্যাদেশই আমরা বিল আকারে পেশ করবো। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে করা ১৩৩ অধ্যাদেশের প্রত্যেকটিই পেশ করা হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ১৩৩টি অধ্যাদশে প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাংবিধানিকভাবে আমরা এসব উপস্থাপন করতে বাধ্য। কিন্তু সেই ১৩৩টি অধ্যাদেশের কোনটা কিভাবে গৃহীত হবে তা সংসদের এখতিয়ার। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন, ওর বাইরে আরও একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। সেই আদেশটার নাম হল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ। ইহা মাস্কুলিন না ফ্যামিনিন নাকি কমন জেন্ডার আমি জানি না। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে আদেশ জারির এখতিয়ার ছিল। যার ভিত্তি ছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের পর সেশনে বসা এবং মুলতবির পর অর্ডিন্যান্স জারির ক্ষমতা পেল রাষ্ট্রপতি। সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর অর্ডারের জামানা শেষ। এখন কিভাবে রাষ্ট্রপতি অর্ডার জারি করলেন? আমরা তখন প্রশ্ন তুলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমরা এই সমস্ত আরোপিত জবরদস্তি কোন আদেশের বলে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের কোন ক্ষমতা খর্ব হতে দেব না। কারণ জাতীয় সংসদের যে নির্বাচন সেটা সংবিধানিক নির্বাচন।
জুলাই সনদ
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু সংসদের পথচলা শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, ৩ মার্চ জুলাই জাতীয় জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। মন্ত্রিপরিষদসচিব, আইনসচিব, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। রিটে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত গণভোট নির্বাচন অসাংবিধানিক ও অবৈধ। জুলাই জাতীয় সনদের অধীনে গণভোট আয়োজন সংবিধানের ৬৫, ১২৩ (৩) (৪) এবং ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি এবং আরপিওর ১১ অনুচ্ছেদ বিরোধী।
ছাত্র-জনতার মূল দাবি ছিল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার। এই লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কারের কাজকে সুসংগঠিত করতে বেশ কিছু বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির সুপারিশগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য করতে গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। তৎকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এই কমিশন দেশের প্রায় সবকটি প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দফায় দফায় সংলাপ করে।
দীর্ঘ আলোচনা, বিতর্ক এবং সংশোধনের পর তৈরি হয় ‘জাতীয় জুলাই সনদ’। এই সনদ মূলত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের রূপরেখা, যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল। দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এই সনদে স্বাক্ষর করে। এর ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
জুলাই সনদের বাস্তবায়নকে জনমানুষের সরাসরি রায়ের ভিত্তিতে বৈধতা দিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের মূল বিষয় ছিল—জনগণ জুলাই সনদ ও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কারের পক্ষে কি না। গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়লাভ করে। সে সময় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলেছিলেন, গণভোটে জনগণের এই রায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের ওপর একটি নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।
কথা ছিল, নতুন নির্বাচিত সরকার সংসদে এই সনদকে আইনি কাঠামোতে রূপ দেবে এবং সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঘোষণা করবে।
এ বিষয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি আমরা শতভাগ অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটা রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল। আমরা স্বাক্ষর করেছি, বরং যারা সমালোচনা করছে তারা স্বাক্ষর করেছে গত কয়েকদিন আগে। নির্বাচনের পরে।
গণভোট
এছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর জনমত যাচাইয়ে যে গণভোট নেওয়া হয়েছে, সেই গণভোটও নেওয়া হয়েছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। ইতোমধ্যে গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সরকার দল বিএনপি সংবিধানের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ করেনি। এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটের রায়কে সম্মান দিতে হলে জাতীয় সংসদে আগে যেতে হবে। আলাপ আলোচনা করতে হবে। আইন প্রণয়ন করতে হবে। সংবিধানে সেটা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। তারপর যদি সংবিধান সংষ্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হয়, সেটা সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে। কোন ফর্মে শপথ হবে সেটা তৃতীয় তফসিলে আনতে হবে। তারপর এটা বিধি সম্মত হবে।
রিটের পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রণীত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ কেন অবৈধ হবে না সেই মর্মে চার সপ্তাহের রুল দিয়েছেন। গণভোট অধ্যাদেশ কেন অবৈধ হবে না সেই মর্মে রুল জারি করেছেন। এর মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোট অধ্যাদেশ বিচারাধীন বিষয় হয়ে গেলো। ঈদের পরে কোর্ট খুললে রুলের চূড়ান্ত শুনানি হবে।
তবে জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী শিশির মনির বলেন, যদি কোনো সুনির্দিষ্ট স্টে বা ডাইরেকশন না থাকে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ না থাকে সেই রুল আদালতকে ফাংশন করতে কোনো বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। সংসদ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।