শিরোনাম :
যেকোনো মূল্যে নেতানিয়াহুকে হত্যা করতে চায় ইরান সংবিধান সংস্কার পরিষদের কোনো অস্তিত্ব নেই:সালাহউদ্দিন আহমদ জ্বালানি তেল বিতরণে বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার ইঙ্গিত ট্রাম্পের সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে যত আলোচনা ১৮ মার্চ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ: কোন দেশে কত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বগুড়ায় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনাল ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে বসতে পারে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন

আফগানিস্তানে খাদ্যসংকট

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় শনিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২২

আফগানিস্তানে অনেক বাসিন্দা তাঁদের ক্ষুধার্ত শিশুদের শান্ত রাখতে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন। আবার অনেকে বাঁচার তাগিদে কিডনির মতো নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা কন্যাসন্তানদের বিক্রি করে দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায় ২০ বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর গত বছরের আগস্টে তাদের সমর্থিত সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে তালেবান। তারা ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ এর পশ্চিমা মিত্র দেশগুলো আফগানিস্তান থেকে নিজেদের মিশন গুঁটিয়ে নেয়। দেশটিতে বন্ধ হয়ে যায় বিদেশি সহায়তার বেশির ভাগও। এ অবস্থায় লাখ লাখ আফগান দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছেন।

গত বছরের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন এ সরকারকে কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানে বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহও। এ পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়া এ আফগানবাসীদের একজন আবদুল ওয়াহাব। বিবিসিকে নিজের কষ্টের কথা বলছিলেন তিনি, ‘আমার বাচ্চারা ক্ষুধায় অনবরত কান্নাকাটি করে। ওরা ঘুমাতে চায় না। আমার ঘরে কোনো খাবার নেই।’ আরও বলেন, ‘তাই, আমি ফার্মেসিতে যাই, ট্যাবলেট কিনি এবং ওদের খাওয়াই; যাতে ওরা একটু ঘুমায়।’

 

আবদুল ওয়াহাব আফগানিস্তানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হেরাতের কাছে থাকেন। তিনি ঘিঞ্জিময় এমন এক বসতিতে থাকেন; যেখানে হাজার হাজার মাটির খুপরি ঘর। দশকের পর দশক ধরে এগুলো গড়ে উঠেছে। এখানে যাঁরা আছেন, তাঁরা যুদ্ধ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে উদ্বাস্তু হওয়া মানুষ।

বিবিসির প্রতিনিধিরা ওই বসতিতে গেলে বেশ কয়েকজন তাঁদের ঘিরে জড়ো হন। তাঁদের মধ্যে কতজন সন্তানদের শান্ত রাখতে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান—জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘আমাদের অনেকে, আমরা সবাই।’

আমার বাচ্চারা ক্ষুধায় অনবরত কান্নাকাটি করে। ওরা ঘুমাতে চায় না। আমার ঘরে কোনো খাবার নেই। তাই, আমি ফার্মেসিতে যাই, ট্যাবলেট কিনি এবং ওদের খাওয়াই; যাতে ওরা একটু ঘুমায়।

এ সময় গুলাম হজরত নামের একজন তাঁর হাত পরনে থাকা আলখেল্লার পকেটে ঢুকিয়ে এক পাতা ট্যাবলেট বের করে আনেন। সাধারণত উদ্বেগ–দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় এ ওষুধ পথ্য হিসেবে সেবন করার অনুমতি দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।

গুলাম হজরতের ছয় সন্তান। সবচেয়ে ছোটটির বয়স এক বছর। তিনি বলছিলেন, ‘এমনকি এতটুকু বাচ্চাকে এ ওষুধ খাওয়াই আমি।’

অন্যরা ভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট দেখিয়ে বলেন, তাঁরাও তাঁদের বাচ্চাদের খাওয়ান এসব। তাঁরা যেসব ট্যাবলেট দেখালেন, সাধারণত সেসব বিষন্নতা ও উদ্বেগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় ব্যবহার করেন চিকিৎসকেরা।

এ ব্যাপারে চিকিৎসকেরা বলেন, যেসব শিশু–কিশোর অপুষ্টির শিকার, তাদের এই ওষুধ খাওয়ানো হলে পাকস্থলি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ, ঘুম ও আচরণে বিশৃঙ্খলা।

স্থানীয় একটি ফার্মেসিতে গিয়ে ওই প্রতিনিধিরা দেখেন, ১০ আফগানিতে (আফগানিস্তানের মুদ্রা) বা এক টুকরা রুটির মূল্যে এ ওষুধ কেনা যায়। তাঁরা কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। জেনেছেন, বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যরাই অল্প কিছু রুটি ভাগাভাগি করে খেয়ে টিকে আছেন। একজন নারী তাঁদের বলেন, তাঁরা সকালে শুকনা রুটি খান। আর রাতে রুটি ভিজিয়ে খান; যাতে তা নরম হয়।

জাতিসংঘ বলেছে, আফগানিস্তানে এখন এক ‘মানবিক বিপর্যয়’ দেখা দিতে চলেছে।

হেরাতের বাইরে যে এলাকার বাসিন্দাদের খাদ্যসংকটের বর্ণনা ওপরে দেওয়া হয়েছে, সেখানকার অধিকাংশ মানুষ দিনমজুরের কাজ করেন। গত কয়েক বছর ধরেই এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

কিন্তু গত বছরের আগস্টে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন এ সরকারকে কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানে বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহও। এ পরিস্থিতিতে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অধিকাংশ দিন ওই সব মানুষের কোনো কাজ জুটছে না। খুব কম দিনই আছে, যেদিন কাজ খুঁজে পান তাঁরা আর উপার্জন করেন কমবেশি ১০০ আফগানি।

প্রতিনিধিরা যেখানেই গেছেন, সেখানকার পরিবারগুলো তাদের ক্ষুধা থেকে বাঁচাতে মরিয়া পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

আম্মার (ছদ্মনাম) নামে ২০–এর কোঠার এক তরুণ বলেন, তিন মাস আগে নিজের কিডনি বেঁচতে তিনি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। এ সময় শরীরের পেছনে অস্ত্রোপচারের জায়গা ও সেলাইয়ের চিহ্ন দেখান তিনি।

আম্মার বলেন, ‘আমার বাঁচার কোনো বিকল্প পথ ছিল না। শুনেছিলাম, স্থানীয় একটি হাসপাতালে কিডনি বেচাকেনা হয়। পরে আমিও সেখানে গিয়ে কিডনি বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করি। কয়েক সপ্তাহ পর হাসপাতাল থেকে ফোন আসে সেখানে যাওয়ার জন্য।’

কিডনি বিক্রি করা তরুণ আম্মার তাঁর পরিবারের দুর্দশার কথা বলছিলেন, ‘আমরা যদি এক রাত খেতাম, তো পরের রাত না খেয়ে থাকতাম। কিন্তু কিডনি বেচার পর আমার মনে হলো, আমি একজন অর্ধমানব। হতাশ হয়ে পড়লাম। এভাবে চলতে থাকলে, আমার মনে হয়, আমি মরে যাব।’
‘তাঁরা (হাসপাতালের লোকজন) কিছু পরীক্ষা করেন। এর পর ইনজেকশন দিয়ে আমাকে অচেতন করেন। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমার করার কিছুই ছিল না’, বলেন আম্মার।

কিডনি বিক্রি করে আম্মার প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার আফগানি (৩ হাজার ১০০ মার্কিন ডলার) পান। এই অর্থের বেশির ভাগটা চলে যায় পরিবারের খাবার জোগাতে করা ঋণ পরিশোধে।

নিরূপায় হয়ে কিডনি বিক্রি করা এই তরুণ তাঁদের দুর্দশার কথা বলছিলেন, ‘আমরা যদি এক রাত খেতাম, তো পরের রাত না খেয়ে থাকতাম। কিন্তু কিডনি বেচার পর আমার মনে হলো, আমি একজন অর্ধমানব। হতাশ হয়ে পড়লাম। এভাবে চলতে থাকলে, আমার মনে হয়, আমি মরে যাব।’

একটা খোলা ও জীর্ণ বাড়িতে দেখা হয় কমবয়সী এক মায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, সাত মাস আগে তিনি কিডনি বিক্রি করেছেন। তিনিও কিডনি বিক্রি করে পাওয়া অর্থে ঋণ পরিশোধ করেছেন। কিছু ভেড়া কিনতে ওই ঋণ করেছিলেন তিনি। কয়েক বছর আগে এক বন্যায় ভেড়াগুলো মারা যায়। এতে উপার্জনের পথ হারিয়ে যায়।

এই মা বলছিলেন, তিনি কিডনি বিক্রি করে যে অর্থ পান, তা তাঁদের জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই এখন দুই বছরের সন্তানকে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। যাঁদের কাছ থেকে ঋণ করেছিলেন, তাঁরা প্রতিদিন তাঁদের হয়রানিতে ফেলছেন। বলছেন, ‘যদি ঋণ শোধ করতে না পার, তবে বাচ্চাটা আমাদের দিয়ে দাও।’

এই নারীর স্বামী বলেন, ‘আমাদের এখন যে অবস্থা, তাতে আমার ভীষণ লজ্জা হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।’

আবদুল গাফফার স্থানীয় কমিউনিটির একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলছিলেন, ‘আমরা বুঝি, এমন কর্মকাণ্ড ইসলামি আইনের বিরোধী। এভাবে আমরা নিজেদের সন্তানদের জীবনও বিপদের মুখে ফেলছি। কিন্তু অন্য কোনো উপায় নেই।’

আবার হজরতউল্লাহ নামের এক বাবা জানান, তিনি তাঁর কিশোরী মেয়েকে বিক্রি করে প্রাথমিকভাবে যে অর্থ পেয়েছেন, তার বেশির ভাগ খাবার কিনতে খরচ করেছেন। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে ছোট ছেলেটার জন্য ওষুধ কিনেছেন। বলেন, ‘ছেলেটার দিকে তাকান, সে অপুষ্টিতে ভুগছে।’ পরে বাচ্চাটার শার্ট উঠিয়ে দেখান, পেট ফুলে আছে।

আফগানবাসীর ক্ষুধার এ কষ্ট দূর করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাওয়া হয় হেরাতে তালেবান সরকারের প্রাদেশিক মুখপাত্রের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি আফগানিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আফগানদের সম্পদ জব্দ করে রাখার ফল।’ তবে তালেবান সরকার সংকট থেকে উত্তরণে জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023