শ্রীলংকার অর্থনীতিকে টালমাটাল অবস্থায় ফেলে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে গেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে। এক প্রকার বিদ্রোহের মুখেই পালিয়েছেন
তিনি। শুধু রাজাপাকসেই নন, ইতিহাসে এমন অনেক প্রেসিডেন্টই বিদ্রোহের মুখে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের আজকের আয়োজন বিভিন্ন দেশের পালিয়ে যাওয়া
কয়েক শাসককে নিয়ে। ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন আজহারুল ইসলাম অভি
গোতাবায়া রাজাপাকসে
শ্রীলংকায় অর্থনীতির দুরবস্থার কারণে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তা কিছুতেই থামছে না। গত শনিবার নতুন করে আবার দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। এদিন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী রাজধানী কলম্বোয় আসেন। তারা প্রেসিডেন্টের বাসভবন ঘেরাও করেন এবং সেখানে ঢুকে পড়েন। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবি করেন। এদিকে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাতে একটি সামরিক বিমানে তিনি মালদ্বীপ যান। তার পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া দেশ ছাড়েন। দেশ ছাড়ার আগে তিনি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে গেছেন। এএফপি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৩ বছর বয়সী গোতাবায়া তার স্ত্রী ও এক দেহরক্ষীসহ চার যাত্রী নিয়ে সামরিক বিমান অ্যান্তোনভ-৩২ মঙ্গলবার মধ্যরাতে বন্দরনায়েক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মালদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এর আগে বিমানবন্দরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বাধার মুখে আকাশপথে বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর সমুদ্রপথে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেন গোতাবায়া। বিমানবন্দরের অভিবাসন কর্মকর্তারা গোতাবায়ার পাসপোর্টে সিল মারতে রাজি না হওয়ায় মঙ্গলবার এ দ্বীপ দেশটি থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য নৌবাহিনীর টহল নৌযান ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া শ্রীলংকার জনগণ দুর্ভোগের জন্য রাজাপাকসে পরিবারকে দায়ী করছে। গত শনিবার তার সরকারি বাসভবনে ঢুকে পড়ে হাজারো বিক্ষোভকারী। এর পর থেকে মূলত আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, গত বুধবার স্থানীয় সময় ভোরে মালের ভেলেনা বিমানবন্দরে পৌঁছায় গোতাবায়াকে বহনকারী সামরিক বিমান। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও দুই নিরাপত্তা প্রহরি। কলম্বোর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের নিয়ে রওনা দেয় সামরিক বিমানটি। মালদ্বীপে পৌঁছানোর পর গোতাবায়া, তার স্ত্রী ও দুই দেহরক্ষীকে গোপনস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসেকে পালিয়ে যেতে ভারত সহায়তা করেছে বলে ওঠা অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রীলংকার ভারতীয় দূতাবাস। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে শ্রীলংকার সরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার মাঝরাতে মালদ্বীপে পালিয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে মালদ্বীপ ছেড়ে চলে যাবেন। তার পরবর্তী গন্তব্য হলো সিঙ্গাপুর। রয়টার্সের কাছে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই সূত্রটি জানায়, সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর পর স্পিকারের কাছে নিজেদের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন- এমন মনস্থির করেছিলেন গোতাবায়া। গোতাবায়া সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যাবেন- এ বিষয়টি জানার পর সিঙ্গাপুরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রয়টার্স। তবে সিঙ্গাপুরের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেওয়া হয়নি।
আশরাফ গনি
প্রায় ২০ বছর শাসনের পর ন্যাটো সৈন্যরা আফগানিস্তান থেকে চলে যাওয়ার পরই তালেবান দখল নিতে শুরু করে আফগানিস্তান। তালেবান বাহিনী আফগানিস্তানের দখল নেওয়ার পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আশ্রয়ে ছিলেন প্রথমে। গত বছরের ১৫ আগস্ট তালেবানের হাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের পতন হয়। তালেবানের কাবুল দখলের মুখে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যান। পালানোর পর টুইটারে শেয়ার করা এক বিবৃতিতে গানি বলেন, দেশে ছেড়ে পালানো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। তিনি এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সহিংসতার ব্যাপকতা এড়াতে তার দেশ ছেড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। গানির দাবি- প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নিরাপত্তা দলের পরামর্শে তিনি আফগানিস্তান ত্যাগ করেন। তিনি কাবুল ও তার ৬০ লাখ জনগণকে বাঁচাতে এমনটাই করেছেন। তিনি জানান, আফগানিস্তানকে ‘গণতান্ত্রিক, উন্নত ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে’ পরিণত করতে তিনি ২০ বছর কাজ করে গেছেন। ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা আশরাফ গানির এভাবে দেশ ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। এমনকি সরকারে থাকা মন্ত্রীদের অনেকেও এভাবে পালিয়ে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি দেশত্যাগের সময় চারটি গাড়ি ও একটি হেলিকপ্টারভরে নগদ অর্থ নিয়ে গেছেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছিল।
ইদি আমিন দাদা
‘দ্য বুচার অব উগান্ডা’ নামে পরিচিত ইদি আমিন দাদা আফ্রিকার ইতিহাসে অন্যতম বর্বর ও স্বৈরাচারী একনায়ক। সত্তরের দশকে উগান্ডায় সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং আট বছরের শাসন আমলে এক লাখের অধিক মানুষকে হত্যা, গুম, নির্যাতন, নির্বাসন কিংবা ফাঁসি দেন এই উগান্ডান কসাই। তবে এ সংখ্যাটি অনেকের হিসাবে ৫ লাখও ছাড়িয়েছে! আমিন সেনাবাহিনীতে থাকাকালে সশরীরে অংশ নিয়েছেন কেনিয়ার ‘মাউ মাউ’ বিদ্রোহীদের ওপর ব্রিটিশদের বর্বরতায়। কেএআরে কাজ করার সময় তিনি যতটা না একজন সৈনিক হিসেবে দক্ষতা ও সুনাম অর্জন করেন, এর চেয়ে বেশি কুখ্যাত হন একজন নিষ্ঠুর অফিসার হিসেবে। কেনিয়ার মাউ মাউ বিদ্রোহীদের দমনের সময় ইদি আমিনের বর্বর ভূমিকাই মূলত তার পদোন্নতি ত্বরান্বিত করেছিল। ইদি আমিনের শাসন আমলে ঠিক কত লোক নিহত হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ১৯৭৫ সালে উগান্ডার মুদ্রাস্ফীতি দশ বছর আগের তুলনায় এক হাজার গুণে গিয়ে দাঁড়ায়! অসন্তোষ দানা বাঁধতে থাকে মানুষের মনে। ১৯৭৮ সালের মধ্যে উগান্ডার পরিস্থিতি একটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। সেনাবাহিনীতে তখন উগান্ডান সৈন্য ছিল মাত্র ২৫ শতাংশ, বাকি সবই ছিল অন্যান্য দেশ থেকে ভাড়া করা সৈন্য। ততদিনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও উগান্ডায় ইদি আমিনের চালানো আদিম বর্বরতার খবর পৌঁছে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন আমিন। দৃশ্যপট বদলাতে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে নিতে আত্মঘাতী এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেন ইদি আমিন। তিনি তানজানিয়া আক্রমণ করেন। কিন্তু অর্থাভাবে তার সৈন্যবাহিনীর পর্যাপ্ত রসদ, খাদ্য ও চিকিৎসা- কোনোটিই ছিল না। অন্যদিকে তানজানিয়ার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় সেখানে নির্বাসিত হওয়া উগান্ডান সৈনিকরা। তাদের মিলিত আক্রমণে দ্রুত পিছু হটে আমিনের অনুগত বাহিনী। বিদ্রোহীরা ১৯৭৮ সালের অক্টোবরের মধ্যে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা দখল করে নেয়। আর স্বৈরাচারী ও প্রতাপশালী ইদি আমিন পালিয়ে গিয়ে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির কাছে প্রাণ রক্ষা করেন। সেখানে দশ বছর কাটানোর পর ১৯৮৯ সালে সৌদি আরবে চলে যান ইদি আমিন। সেখানেই নির্বাসন জীবনে ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন ‘বুচার অব উগান্ডা’ নামে কুখ্যাত এই একনায়ক।
অ্যাপোলো মিল্টন ওবোতে
অ্যাপোলো মিল্টন ওবোতে ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশবাদ প্রশাসন থেকে উগান্ডাকে স্বাধীনতার দিকে ধাবিত করেছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত উগান্ডার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। অধিকাংশ সামরিক স্বৈরশাসকেরই ক্ষমতায় আরোহণ ঘটে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ‘বুচার অব উগান্ডা’ নামে পরিচিত ইদি আমিন দাদাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি ওবোতের সঙ্গে বন্ধুত্বের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের সামরিক ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি করেন। গোপনে ব্রিটিশ ও ইসরায়েলি গুপ্তচরদের সঙ্গেও সখ্য গড়ে তোলেন। তবে এসব তথ্য চাপা থাকেনি। সবকিছুই জেনে যান ওবোতে। প্রথমে তিনি আমিনকে গৃহবন্দি করেন। কিন্তু ততদিনে আমিনের বেশ প্রভাব ও সেনাবাহিনীতে একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। ফলে তাকে গৃহবন্দি রাখা সম্ভব হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে ওবোতে আমিনকে মুক্ত করে দেন এবং একটি অপ্রসাশনিক পদে নিয়োগ করেন। এর পর থেকেই আমিন সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন কখন ক্যু ঘটাবেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ জানুয়ারি। ওবোতে তখন রাষ্ট্রীয় সফরে সিঙ্গাপুর ছিলেন। আমিন এই সুযোগে ক্যু করলেন এবং দেশের ক্ষমতা দখল করে নিলেন। ক্ষমতা দখল করেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। ইদি আমিনের ক্ষমতা গ্রহণের পর ওবোতে তানজানিয়ায় পালিয়ে যান। সেখান থেকে ১৯৭২ সালে নিজের সমর্থকদের নিয়ে একটি ক্যু করার চেষ্টা চালান। তার ক্যুর সমর্থনে উগান্ডার সেনাবাহিনীর একটি অংশ ছাড়াও তানজানিয়ার আচোলি ও ল্যাঙ্গো সম্প্রদায়ের সামরিক কর্মকতারাও যোগ দেন। কিন্তু ক্যু ব্যর্থ হয়।
রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ যারা পালিয়েছিলেন
রবার্ট মুগাবের স্ত্রী গ্রেস মুগাবে
৯৩ বছর বয়সী মুগাবের দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রেস মুগাবে। টাইপিস্ট থেকে জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হন তিনি। মুগাবের চেয়ে ৪০ বছরের ছোট গ্রেস ধীরে ধীরে ক্ষমতার প্রায় কেন্দ্রে চলে আসেন। ধারণা করা হচ্ছিল, মুগাবের অনুপস্থিতিতে কিংবা মারা গেলে দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন গ্রেস মুগাবে। ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর সেনাবাহিনী মুগাবেকে গৃহবন্দি করে। তবে এর মধ্যে তার স্ত্রী গ্রেস মুগাবে দেশ ছেড়ে পালান। তিনি নামিবিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তার আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগবাকে বরখাস্ত করার পর থেকে রাজনৈতিক সংকটের সূত্রপাত শুরু হয়েছিল। এতদিন নানগাগবাকেই মুগাবের উত্তরসূরি ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি ৫২ বছর বয়সী স্ত্রী গ্রেস মুগাবেকে উত্তরসূরি করার পরিকল্পনা করেন। এ জন্য অবশ্য স্ত্রীই মুগাবেকে প্রলুব্ধ করেন বলে মনে করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিনি বরখাস্ত করেন ভাইস প্রেসিডেন্টকে। ৭৫ বছর বয়সী নানগাগবা দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে বেশ জনপ্রিয়। মুগাবের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয় সেনাবাহিনী। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে নানগাগবাকে বসাতে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনারা। বরখাস্ত হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যাওয়া নানগাগবা পরদিন দেশে ফেরেন। এর পর শুরু হয় মুগাবের সঙ্গে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত গ্রেস মুগাবে নিজেই পালিয়ে গিয়েছিলেন দেশ ছেড়ে।
আত্মগোপনে থেকেও বাঁচতে পারেননি গাদ্দাফি, পালিয়ে বেঁচেছেন পুত্র
লিবীয় নেতা মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফি ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৬৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের রক্তিম চক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করে গেছেন দোর্দ- প্রতাপে। কিন্তু ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্তের ছোঁয়ায় গাদ্দাফি আর টিকে থাকতে পারেনি। আগস্ট পর্যন্ত গাদ্দাফি লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতেই ছিলেন। ২০ আগস্ট বিদ্রোহীদের হাতে ত্রিপলির পতনের প্রাক্কালে তিনি সপরিবারে ত্রিপলি ত্যাগ করে পালিয়ে যান। তবে তাদের সবার গন্তব্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন। গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গিয়েছিলেন গাদ্দাফির সমর্থকদের শক্তিশালী ঘাঁটি পার্বত্য শহর বানি ওয়ালিদে। তার আরেক ছেলে খামিস। তিনি লিবিয়া সেনবাহিনীর ৩২ নম্বর ব্রিগেড পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ত্রিপলি ছেড়ে যাওয়ার পথে তারহুনায় ন্যাটোর বিমান হামলায় নিহত হয়েছিলেন। আর গাদ্দাফির স্ত্রী সাফিয়া, কন্যা আয়েশাসহ পরিবারের বাকি ছেলেদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র আলজেরিয়ায়। এর এক মাস পর সিরত ছেড়ে পালাতে গিয়েই মূলত ধরা পড়েন গাদ্দাফি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০ অক্টোবর রাত সাড়ে ৩টা বা ৪টার দিকে ৪০টির মতো গাড়িতে করে তারা বেরিয়ে যাবেন। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্তরা কেউই প্রশিক্ষিত সেনা সদস্য ছিলেন না। তারা অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ৪০টি গাড়ির বহরে করে ১৬০ থেকে ১৮০ জনের মতো সদস্যের দলটি ডিস্ট্রিক্ট টু থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে। এই বহরের একটি টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার জিপে ছিলেন গাদ্দাফি। ওই সময় তাদের তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। শুধু একটাই লক্ষ্য ছিল- যে কোনো উপায়ে এই মৃত্যুপুরী থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কোন পথ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, কোন পথে বিদ্রোহীদের কয়টি চেক পয়েন্ট, বিদ্রোহীদের সৈন্য সংখ্যা মোট কত- এর কিছুই তাদের জানা ছিল না। যাত্রা শুরু করার আগে যে অনুসন্ধানী দল পাঠানো হবে, ওই উপায়ও তাদের ছিল না। গাদ্দাফির গাড়ির বহরটি পরিত্যক্ত এলাকার ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকে। একটু সামনে গিয়েই তারা বিদ্রোহীদের একটি ছোট মিলিশিয়া গ্রুপের মুখোমুখি হয়। গ্রুপটি ছোট হওয়ায় গাদ্দাফির সঙ্গে থাকা স্বেচ্ছাসেবীরা সহজেই তাদের পরাজিত করে ওই এলাকা থেকে বেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠে পড়তে সক্ষম হয়। মূল রাস্তায় উঠে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হওয়া মাত্রই তাদের গাড়িবহর ন্যাটোর চোখে পড়ে যায়। ন্যাটোর যুদ্ধবিমান পর পর দুটো মিসাইল নিক্ষেপ করে। এর মধ্যে একটি সরাসরি গাদ্দাফির সামনের গাড়িটিকে ধ্বংস করে দেয়। বিস্ফোরণের আঘাতে গাদ্দাফির গাড়ির এয়ারব্যাগ খুলে যায় এবং মিসাইলের টুকরো এসে মানসুর দাওর কপালে আঘাত করে। এ সময় গাদ্দাফির পরনে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও মাথায় হেলমেট ছিল। এর পরও তিনি সামান্য আহত হন। ন্যাটোর হামলা থেকে বাঁচার জন্য মূল রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তা দিয়ে আবারও পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করেন। দুর্ভাগ্যবশত তাদের ঠিক সামনেই ছিল বিদ্রোহী মিলিশিয়াদের একটি ঘাঁটি। উপায় না দেখে মৌতাসেম এ ঘাঁটি ভেদ করেই এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা সোজা বিদ্রোহীদের ঘাঁটি লক্ষ্য করে আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মেশিনগান, অ্যান্টিএয়ারক্রাফট আর মিসাইল দ্বারা পাল্টা আক্রমণ শুরু হয়। এ ছাড়া ওপর থেকে বিমান হামলা শুরু করে ন্যাটো। গাদ্দাফি ও তার দল নিরুপায় হয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়েন এবং পাশে অবস্থিত একটি খামারের মধ্যে থাকা দুটি পুরনো বাড়ির দিকে অগ্রসর হন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি গাদ্দাফির। আটক করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্দি অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় ৬৯ বছর বয়সী বৃদ্ধ নেতা মোয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে। তবে গাদ্দাফির যে ছেলেকে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো, সেই সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। পশ্চিমা বিমান হামলায় গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েক সঙ্গী নিয়ে পাশের দেশ নিজারে পালিয়ে যাওয়ার সময় সীমান্তে মরুশহর আওবারি থেকে একদল সশস্ত্র বিদ্রোহীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। তখন থেকেই তিনি ‘জিনতান ব্রিগেড’ নামের ওই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর কব্জায়। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির আদালতে তার মৃত্যুদ-ও হয়েছে। কিন্তু জিনতান ব্রিগেড কারও কাছেই তাকে হস্তান্তর করেনি। গত বছর অবশ্য তার রাজনীতিতে ফেরা নিয়ে আলোচনা শোনা যাচ্ছিল।
শ্রীলংকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আলোচনায় যে তিন নাম
গোতাবায়া পদত্যাগ করলে তার জায়গায় সম্ভাব্য প্রার্থী হচ্ছেন তিনজন। তারা হলেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে, শ্রীলংকা পদুজানা পেরামুনার (এসএলপিপি) এমপি ডালেস আলাহাপেরুমা ও বিরোধীদলীয় নেতা সাজিদ প্রেমাদাসা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে বাকি মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকতে চান। এসএলপিপির একটি অংশ তাকে সমর্থনও করে যাচ্ছে। তবে এসএলপিপির আরেকটি অংশ তাকে ওই পদে রাখতে চায় না। তাকে রুখতে তারা বদ্ধপরিকর।