স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলার হঠাৎ তেজি হয়ে উঠেছে। দাম বেড়েছে ব্যাংকিং চ্যানেলে। কার্ব মার্কেটেও ডলার মূল্য চড়া। করোনাকালীন লকডাউন পরবর্তী এই সময়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে নেতিবাচক হিসাবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ডলারের মূল্য বাড়লে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তাতে পণ্যমূল্যও বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে রয়েছে। ডিলার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনাও চলছে। ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বলছেন, এ সময়ে ডলারের দাম বেড়ে গেলে তা হবে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা।
ব্যাংকিং সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ডলারের দাম বরাবরই বেড়েছে। মূল্যবৃদ্ধির হিসাব করলে দেখা যায়, গত ২৫ বছরে ডলারের দাম বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। সূত্রমতে, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে না রাখলে ডলারের দাম আরো আগেই ৯০ টাকা ছাড়িয়ে যেত। যদিও বাংলাদেশে মুদ্রার ভাসমান বিনিময় হার কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশে ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্বাধীনতার পর থেকে সরকার নির্ধারণ করে দিত। টাকাকে রূপান্তরযোগ্য ঘোষণা করা হয় ১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ। আর ২০০৩ সালে এই বিনিময় হারকে করা হয় ফ্লোটিং বা ভাসমান। এর পর থেকে আর ঘোষণা দিয়ে টাকার অবমূল্যায়ন বা পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। তবে বিনিময় হার ভাসমান হলেও পুরোপুরি তা বাজারভিত্তিক হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সব সময়ই এতে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রেখেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে অনুসরণ করে আসছে ‘ম্যানেজড ফ্লোটিং রেট’ নীতি।
ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধির খড়গ পড়ে উদ্যোক্তার ওপর। ব্যবসা কিংবা শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি করতে এলসি খুলতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ৯০, ১২০, ১৮০ ও ৩৬০ দিন আগে ব্যাংক কোনো মেশিনারিজ ও পণ্য আমদানি বাবদ ব্যয়ের হিসাব করে থাকে।
কিন্তু আলোচ্য সময়ের মধ্যে কিংবা এর পরেও ডলারের মূল্য বেড়ে গেলে তা গ্রাহকের কাঁধে চাপে। এমনকি ঋণ পুরোপুরি শোধ না হওয়া পর্যন্ত ডলারের বাড়তি দাম গ্রাহককেই দিতে হয়। এতে মোট ব্যয় যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় তা গ্রাহক ব্যাংক থেকে নেয়নি। অথচ পরিশোধের সময় তাকে বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে। তদুপরি, একেক ব্যাংকে একেক দরের বিষয়টিও মনিটর না করায় উদ্যোক্তা বিপাকে পড়েন। যার রেশ টানতে হয় ক্রেতা-ভোক্তাকেও।
সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত জুলাই শেষেও ডলারের দাম কমবেশি ৮৫ টাকার মধ্যে ছিল। গত বৃহস্পতিবার কোনো কোনো ব্যাংক ৮৭ টাকায়ও ডলার বিক্রি করেছে। হঠাত্ ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা। শুধু আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিই নয়, বরং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্যাংকিং খাতে নেওয়া ঋণের অঙ্কও বেড়ে যায়। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসায় উদ্যোগ। দিনশেষে ক্রেতার ওপরই তা বর্তায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, ২০০০ সালে আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের মূল্য ছিল ৫৪ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে হয় ৭১ টাকা। ২০১৮ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের দামে ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল। যদিও ফ্লোটিং এক্সচেঞ্জ রেট কার্যকর থাকলে তা করা যায় না। কিন্তু সেখানেও স্থির থাকেনি ডলারের দাম। বর্তমানে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ৮৭ টাকা। খোলা বাজারে এই বিক্রি হচ্ছে ৮৮ টাকার বেশি।
গত ২৫ বছরের মূল্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে ৪০ টাকায় পাওয়া যেত এক ডলার। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন প্রতি ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যেত ৬৯ টাকা। করোনার এই সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লকডাউন কাটিয়ে নতুন করে পথ চলা শুরু হওয়ার এই মুহূর্তে ডলারের দাম বেড়ে গেলে তা অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছে সূত্রগুলো।