মুক্তজমিন ডেস্ক
প্রতিবছর কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর ভাঙনে সহস্রাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ও নানা স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বছরের পর বছর এ অবস্থা চলতে থাকলেও টেঁকসই কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। শুধু বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলেই ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। এতো কোনো লাভ তো হচ্ছেই না, বরং সরকারি পয়সা জলে যাচ্ছে।
এভাবে ক্রমাগত ভিটেমাটিসহ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষ। তিস্তাপাড়ের মানুষের এখন একটাই দাবি, এই দীর্ঘ কষ্টের অবসান।
এদিকে স্থায়ী ভাঙন ঠেকাতে তিস্তা নিয়ে মহাপরিকল্পনার অপেক্ষায় রয়েছে সরকার। আর এ অপেক্ষার মধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা। এ অবস্থায় তিস্তায় কোনো প্রকল্প না থাকলেও কবলিত এলাকাগুলোর ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে কিছু এলাকা সাময়িক রক্ষা পেলেও তা স্থায়ী নয়। তাই দ্রুত স্থায়ী ভাঙন রোধে সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি স্থানীয়দের।
এ জেলার ওপর দিয়ে ৪৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে খরস্রোতা তিস্তা নদী। প্রতিবছর নদীর দুই পাড়ে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। চলতি বর্ষা মৌসুমেও নদীর দুই পাড়জুড়ে ভাঙন দেখা দিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা বাঁচাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তার পানি বাড়া-কমার সাথে সাথে রাজারহাট ও উপজেলার চর গতিয়াসাম, বুড়িরহাট, তৈয়বখাঁ, খেতাবখাঁ, ঠুটা পাইকর এবং উলিপুর উপজেলার গোড়াই পিয়ার, দালালপাড়া, হোকডাঙ্গা, ডাক্তারপাড়া ও অর্জুনসহ বেশকিছু এলাকায় ভাঙন তীব্র হয়ে উঠেছে। এসব এলাকার প্রায় শতাধিক পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
সরেজমিনে রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার তৈয়বখাঁ, বুড়িরহাট ও থেতরাই ইউনিয়নের গোড়াই পিয়ারসহ ভাঙন কবলিত কিছু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ঘনববসতিপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে করে কিছু এলাকা অস্থায়ী ভিত্তিতে রক্ষা হলেও নদীর তীব্র স্রোতে অনেক এলাকায় ভাঙন রোধের চেষ্টা কোনো কাজেই আসছে না।
এদিকে সাময়িক ভাঙন ঠেকানো এলাকার মানুষের দাবি, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধ করা হোক। আর যেসব ভাঙন কবলিত এলাকায় এখনো জরুরি কাজ শুরু হয়নি সেসব এলাকার মানুষের দাবি জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন ঠেকানোর পাশাপাশি দ্রুত তিস্তার ভাঙন রোধে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক।
রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়বখাঁ এলাকার বাসিন্দা কামাল সরকার বলেন, আমার বাড়ি তিস্তার একেবারেই কিনারে। ভাঙন শুরু হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড বালুর বস্তা ফেলে তা ঠেকিয়ে রেখেছে। এতে আপাতত ভাঙন থেকে রক্ষা পেলেও এই বালুর বস্তা হয়তো আগামী বছর থাকবে না। নদীর নিচে চলে যাবে। তথন আবার ভাঙনে ঘরবাড়ি হারাতে হবে। আমরা চাই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে দ্রুত স্থায়ী ভাঙন রোধের ব্যবস্থা।
একই এলাকার সুধা রানী বলেন, এর আগে কয়েকবার ভাঙনের শিকার হয়ে বর্তমানে ফের ভাঙনের হুমকিতে রয়েছি। এই তিস্তার ভাঙনে আমরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। আমার বিয়ের উপযুক্ত একটি মেয়ে রয়েছে, তার বিয়েও দিতে পারছি না। লোকজন দেখতে এসে নদী ভাঙা দেখে চলে যায়।
উলিপুর উপজেলার গোড়াইপিয়ার এলাকার ফজলুল হক বলেন, তিস্তার ভাঙনের কবলে পড়ে গ্রামটির বেশিরভাগ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিস্তার নানা বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, তিস্তার উজানে ভারতীয় অংশে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে উলিপুর ও রাজারহাট উপজেলার কিছু এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে তিস্তার কোনো প্রকল্প চলমান নেই। তারপরও আমরা যে এলাকাগুলোতে মেজর স্থাপনা রয়েছে, সে এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ডাম্পিং করে ভাঙন রোধ করছি। দু’একটা জায়গায় বড় ভাঙন রয়েছে, সেখানে কাজ করার জন্য আমরা বরাদ্দ চেয়েছি। বরাদ্দ পেলে সেখানে কাজ করে রক্ষা করতে পারবো।
তিনি বলেন, আমরা আশা করছি তিস্তা নিয়ে যে মহাপরিকল্পনা বা মেগা প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, এটা প্রধানমন্ত্রী যদি অনুমোদন দেন তাহলে তিস্তাপাড়ের মানুষের যে নদী ভাঙার দুঃখ সেটা থাকবে না। পাশাপাশি খনন হলে নদীও জীবন ফিরে পাবে।
স্থানীয়রা জানান, সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে হাজার হাজার হেক্টর অনাবাদী জমি পরিণত হবে আবাদী জমিতে। তিস্তার দুই পাড় হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। দুঃখ ঘুচবে নদীপাড়ের মানুষের।