নেইমারদের হতাশায় ডুবিয়ে শিরোপা জিতলো বায়ার্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২০

স্পোর্টস ডেস্ক

ট্রফিটার ওপরে যখন বায়ার্ন মিউনিখের নাম খোদাই করা হচ্ছে, দূরে গ্যালারিতে মোহিকান-কাট চুলের নেইমার দুই হাতের মধ্যে মাথা ঠেকিয়ে শাপ-শাপান্ত করছেন নিজেকেই। খানিক পর কাছে গেলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। একটা দৃশ্য তৈরি হলো। এমবাপ্পে গলা জড়িয়ে ধরেছেন নেইমারের, নেইমার এমবাপ্পের। কী কথা হলো দুজনায়? ‘ আয় ভাই, দুজনে গলা ধরে কাঁদি’-এ ছাড়া আর কীইবা অনুমান করা যায়!

 

মূলত এই দুজনের ওপরই শিরোপা জয়ের আশাটা ছিল প্যারিস সেন্ত জার্মেইর। তারা যখন পাওয়া সুযোগগুলো সূক্ষ্মভাবে ফিনিশ করতে ব্যর্থ হন, বায়ার্নই তো উৎসব করবেই। শারীরিক শক্তি ও সামর্থ্যে প্রায় যন্ত্রের মতো উপস্থিতির সঙ্গে স্কিল যোগ হওয়ায় জার্মান দলটি ভয়ঙ্কর। পরিষ্কার একটি সুযোগ কাজে লাগিয়েই রবিবার রাতে তারা ১-০ গোলে জিতে উৎসব করলো লিসবনের (বেনফিকার) মাঠে। ৫৯ মিনিটে ফরাসি দলটির বুক ভেঙে দেওয়া গোলটি করেছেন এক ফরাসি যুবক, কিংসলি কোম্যান। চমৎকার দলীয় গোল। ডান প্রান্ত থেকে সার্জ জার্নাব্রির পেছনে ঠেলা বল টমাস মুলারের কাছ থেকে পেয়ে থালায় সাজিয়ে দেওয়া ক্রসটা করেছিলেন জসুয়া কিমিচ। লেফট উইংয়ে খেলা কোম্যান জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখেশুনে দূরের পোস্টে বল পাঠিয়েছেন হেড করে।

 

এরপরও সময় ছিল ৩১ মিনিট। কিন্তু পিএসজি অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে বায়ার্নকে চেপেই ধরতে পারেনি। ৮৯ মিনিটে চুপো-মটিংয়ের অলস শট চলে গিয়েছিল এমবাপ্পের কাছে, কিন্তু বিশ্বকাপজয়ী ফরাসি স্ট্রাইকারের ১০ গজ দূরের শট পা দিয়ে রুখে দেন বায়ার্ন গোলকিপার ও অধিনায়ক ম্যানুয়েল নয়্যার। বিরতির কেবলই আগে এরকম ৮-১০ গজ দূর থেকেও নয়্যারকে পরাস্ত করতে পারেননি এমবাপ্পে। আগেই গোল করার সুযোগ ছিল বায়ার্নেরও। ৩০ মিনিটে লেভানডভস্কির শট প্রতিহত হয়েছে পোস্টে। বিরতির আগে গোলদাতা কোম্যানই একবার পেনাল্টির আবেদন করেছিলেন। আবেদন প্রত্যাখ্যান করার আগে ইতালিয়ান রেফারিকে নিশ্চিতই বার দুয়েক ভাবতে হয়েছে।

 

দুটি আক্রমণাত্মক দল মুখোমুখি, অনেকেই ভেবেছিলেন গোল আর পাল্টা গোলের প্রদর্শনী দেখে স্বার্থক হবে দুচোখ। সেটির কিছুই হলো না। হলো না, কারণ নেইমার-এমবাপ্পে-ডি মারিয়াদের সামর্থ্যের সঙ্গে প্রয়োগ ক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটেনি। আর উল্টোদিকে বায়ার্ন তো প্রথম মিনিট থেকেই পণ করে বসেছিল, বলের দখল প্রতিপক্ষের পায়ে দিয়ে মাঠের দখল নিতে দেবে না। সেটি তারা করতে পেরেছে।

 

ম্যাচে নিরঙ্কুশ ফেবারিটের তকমাটা বায়ার্ন মুহূর্তের জন্য খসে পড়তে দেয়নি। সাক্ষ্য দেবে পরিসংখ্যান। তবে অনেকেই পিএসজির হাতে ট্রফি দেখছিলেন,  নেইমার-এমবাপ্পের মতো বিশ্বমানের দুই ফরোয়ার্ডের বোঝাপড়া দেখে। কিন্তু দুজন খেলোয়াড়ের মধ্যে বোঝাপড়া হলেই হয় না, বাকিদেরও এগিয়ে আসতে হয়। সেটি হয়নি। আরও কিছু লাগে, যেটিকে বলে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’। সেই এক্স-ফ্যাক্টরকে মাটিতেই নামতে দেয়নি হানসি ফ্লিকের দল।

 

১৯৮৭ সালে ভিয়েনার মাঠে পোর্তোর কাছে ইউরোপিয়ান কাপের (অধুনা চ্যাম্পিয়নস লিগ) ফাইনালে হেরে যাওয়া বায়ার্ন দলের সদস্য ছিলেন ফ্লিক। কোচ হিসেবে বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে হারতে তিনি চাননি। আর উল্টোদিকের জার্মান কোচ বায়ার্নের কাছে শুধু হারছেন আর হারছেন। দুই বছর আগে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের ডাগআউট ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার আগে বায়ার্নের কাছে হেরেছেন নয়বার, জার্মানির ঘরোয়া ফুটবলে যা সবচেয়ে বেশি হারের রেকর্ড। টমাস টুখেল পিএসজিকে ইউরোপীয় গৌরবের আলোয় ভাসানোর পাশে এটাও খুব করে চেয়েছিলেন যে বায়ার্নকে অন্তত একটা হার ফিরিয়ে দেবেন। হলো না। আসলে বায়ার্ন দলটি এমনই যন্ত্রের মতো নিখুঁত যে তাদের হারানো সহজ নয়।

 

মেসির ছায়া থেকে বেরোতে পিএসজিতে যাওয়া। পিএসজিকে ফাইনালে তুলেই সশব্দে একটা অনুরণন নেইমার তুলতে পেরেছিলেন যে কথিত ছায়া থেকে প্রায় বেরিয়ে এসেছেন। কিছুটা যে পেরেছেন তাতে ভুল নেই। ট্রফিটা জিততে পারেননি বলে সবাই বলবে পুরোপুরি পারেননি। একটা খেদ থেকে গেল। বিশ্বকাপের সঙ্গে ক্লাব ফুটবলের তুলনা যদিও চলে না, তবে অপূর্ণতা থেকে গেল আরেকটিও। সেই যে ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে দর্শক হিসেবে চোটগ্রস্ত অবস্থায় জার্মানির কাছে ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে চূর্ণ হতে দেখেছিলেন, সামান্য হলেও সেটির শোধ নেওয়া গেল না। সেই জার্মানি দলটির নিউক্লিয়াসই যে ছিল বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়েরা।

 

তবে পিএসজির এই হারেও অগৌরবের কিছু নেই। পেট্রো ডলারে ভেজা যে দলটিকে বলা হতো চ্যাম্পিয়নস লিগের চিরকালীন কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট, তারা প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেললো। শুধু খেললো কি, হাত ছোঁয়া দূরত্বে ট্রফিটা তাদের বঞ্চনাই করলো। এবার হয়নি, আগামীবার হবে। নেইমারের মধ্যে সত্যিকারের এক নেতার উদয় সেই ভরসা দেয়। আর ফাইনালে উঠে বায়ার্নও তো হার কম দেখেনি। দ্বাদশ ফাইনালে উঠে ষষ্ঠ শিরোপা, মানে শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ব্যর্থতা। মানে হারতে হারতে জয়ের রাস্তা চিনে ওঠা জার্মান চ্যাম্পিয়নদের।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023