রংপুর প্রতিনিধি
সরকারের পক্ষ থেকে তামাক আবাদে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হলেও নীলফামারী জেলায় তামাক চাষ কমছে না। সম্প্রতি জেলা সদরের পলাশবাড়ি ইউনিয়নের কানাইকাটা বামনডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুদের তামাক ক্ষেতে কাজ করতে দেখা যায়। জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও অব্যাহত রয়েছে ক্ষতিকর এই ফসলের চাষ। সরেজমিনে কৃষকদের উৎসাহ দেখে মনে হয়েছে, যেন তামাক আবাদের উৎসব শুরু হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এ বছর জেলার ছয় উপজেলায় তিন হাজার ৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। অপরদিকে, স্থানীয় তামাক ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের হিসাবে নীলফামারী জেলায় তামাক চাষ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এরপরও বিড়ি ও সিগারেট কোম্পানিগুলোর লোভনীয় আশ্বাসে কিছুতেই থামছে না তামাক চাষিরা। মাঠের পর মাঠ তামাক ক্ষেত।
জেলা সদরের ইটাখোলা, লক্ষ্মীচাপ, কচুকাটা, টুপামারী, পঞ্চপুকুর, গোড়গ্রাম, খোকশাবাড়ি, কুন্দপুকুর, চাপড়া সরেমজামি, সোনারায়, সংগলশী; জলঢাকা উপজেলার খুটামারা, কাঠালী, কৈমারী, শৌলমারী, মীরগঞ্জ, গোলনা, বালাগ্রাম, ডাউয়াবাড়ি, গোলমুণ্ডা; ডিমলা উপজেলার সদর, বালাপাড়া, নাউতারা; ডোমারের সদর, হরিণচড়া, বোড়াগাড়ী, জোড়াবাড়ি, বামুনিয়া, কেতকীবাড়ি, ভোগডাবুড়ি এবং কিশোরীগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা ও পুটিমারী এলাকায় সব চেয়ে বেশি তামাক আবাদ হয়েছে।
জেলা সদরের পলাশবাড়ি ইউনিয়নের কানাইকাটা বামনডাঙ্গা গ্রামের চাষি আর্জিনা বেগম বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছি। এতে আমার খরচ হয়েছে ৮ হাজার টাকা। আকিজ কোম্পানি অগ্রিম ঋণে সার ও নগদ অর্থ দিয়েছে। তামাক কেনার শতভাগ নিশ্চিয়তাও দিয়েছে কোম্পানিটি।’
অপর চাষি মুক্তা আক্তার বলেন, ‘দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষে ১০ হাজার টাকা খরচ করেছি। এখান থেকে ৩০-৩৫ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। কোনও কোনও সময় ৫০ হাজার টাকাও পাওয়া যায়; যা ধান, আলু, মরিচ, কপি বা সরিষা চাষ করে পাওয়া যায় না।’
বাবা-মার সঙ্গে তামাক ক্ষেতে কাজ করা শিশু সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘আজ স্কুলে না গিয়ে মা বাবার সঙ্গে জমিতে পানি দিতে এসেছি।’
চার বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন একই গ্রামের সুলতান আলী। তিনি বলেন, ‘আমার ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। শ্যালো মেশিন ভাড়া করে এনে জমিতে পানি দিচ্ছি।’
সদরের রামনগর ইউনিয়নের চড়চড়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চাষিদের সুবিধার জন্য কোম্পানিগুলো জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক বড় বড় ক্রয়কেন্দ্র ও গোডাউন তৈরি করেছে। জমি থেকে সরাসরি সেখানেই চলে যায় উৎপাদিত তামাক। নীলফামারীতে তামাক ক্রয়ের জন্য ঢাকা ট্যোবাকো, আবুল খায়ের ট্যোবাকো, নাসির ট্যোবাকো, আকিজ ট্যোবাকোসহ বেশ কয়েকটি তামাক কোম্পানি রয়েছে। এই তামাক কোম্পানিগুলোর সুপারভাইজার ও কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত তামাক চাষিদের খোঁজ খবর রেখে সহযোগিতা করে আসছেন।’
জেলা সদরে লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের মাঠে সবজির চেয়ে তামাক চাষ বেশি হচ্ছে বলে জানান কৃষক গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘বেশ কিছু চাষি তামাক কোম্পানির প্রলোভনে পড়ে এই মৌসুমে বোরো, গম, ভুট্টাসহ অন্য রবিশস্য আবাদ কমিয়ে তামাক চাষের প্রতি ঝুঁকেছেন।’
শুধু নীলফামারী নয়, তামাক কোম্পানিগুলোর আর্থিক সহযোগিতায় দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্য জেলাগুলোতে তামাক চাষ বাড়ছে বলে সচেতন মহলের অনেকেই জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কোম্পানিগুলো বিনা মূল্যে তামাক বীজ, বিনা সুদে ঋণ, সার ও নগদ অর্থ সরবরাহ করছে।
তামাক চাষিদের অভিযোগ, তামাক কোম্পানির কর্মীরা প্রতিদিন মাঠে গিয়ে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে অন্য ফসল উৎপাদনে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা যায় না। বোরো মৌসুমে বীজতলা, সবজি ও ফসলের ক্ষেত নষ্ট হলেও কৃষি অফিসের লোকজনকে সংবাদ দিয়েও পাওয়া না।
সদর উপজেলার তামাক আড়তদার শফিকুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের উৎপাদিত পণ্যের ৮৫ ভাগ আয় আসে তামাক থেকে; যা দিয়ে কৃষকরা সংসারের খরচ ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগান দেয়। অন্য ফসলের ক্রয়-বিক্রয়ের নিশ্চয়তা এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে তামাক চাষের প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক নিখিল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘খরচ কম, লাভ বেশি। তাই অতিরিক্ত মুনাফার আশায় ক্ষতির কথা চিন্তা না করে কৃষকরা দিন দিন ঝুঁকে পড়ছে তামাক চাষে। ফলে চাষি ও তার পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে এবং ফসলি জমি উর্বরতা হারাচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের এসব বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।’