শিরোনাম :
দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর ৬০ অর্জন বগুড়ায় সাইক জেনারেল হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি সেন্টার’র যাত্রা শুরু বগুড়া ৫ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার উদ্বোধন করলেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এমপি অসাম্প্রদায়িক-শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন এখনও অধরা জাতিসংঘে দাসত্ব ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃত, বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ক্রীড়াঙ্গনকে পেশাদার রূপ দিতে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর কাহালুতে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন শিবগঞ্জে মহান স্বাধীনতা দিবস পালিত মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বগুড়া প্রেসক্লাবের আলোচনা সভা শিবগঞ্জে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও মিটার চুরির অভিযোগে শিপন গ্রেফতার

সাধক ওগো প্রেমিক ওগো

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

বাঙ্গালীর শত বর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে এমন সাধক, এমন প্রেমিক আর একজনও পাওয়া যাবে না। তাঁর সাধনায় বাংলা নামের দেশ, আর তাঁর প্রেমময় অন্তর জুড়ে এই দেশের মানুষ। এমন এক সাধক ও প্রেমিক চিত্রিত করেই কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর লিখেছিলেন পূজা পর্বের গানটি। সুরও তারই দেয়া। গানটি রচনার পটভূমি সম্পর্কে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা দুই রকম মত দেন। কেউ বলেন যিশুখৃষ্টের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর এই রচনা; কেউ বলেন নিজের বাবার স্মরণে লেখা এটি। প্রেক্ষাপট যাই হোক, এই গানের সাথে আমরা আমাদের সাধক প্রেমিককে যখন মেলাই তখন নিশ্চিত ভাবেই মানি, কবিরা যে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা তা’ প্রমাণিত আবারো।

 

১৯১০ সনে শান্তিনিকেতনে বসে কবি বলছেন: ‘কোন্‌ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস/ সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো/পাগল ওগো, ধরায় আস।’ তাঁর মাত্র দশ বছরের মাথায় ১৯২০ সনে বঙ্গের পূর্ব অংশের এক অজ পাড়াগাঁয়ে এক সাধক প্রেমিকের ধরায় আগমন যে অবধারিত হয়ে আছে সে বিষয়ে কবি যেন নিশ্চিত হয়েই সুর তাল লয় ও ছন্দে এই চিত্রকল্প তৈরি করেছিলেন। দেশমাতৃকার সাধনায় দেশের অবহেলিত নিষ্পেষিত মানুষের প্রেমে পাগল এই সাধক। পরে এই ‘অকুল সংসারে’ এই সাধক-প্রেমিকের প্রাণের বীণা ঝংকৃত হয়েছে নানা পর্বে, নানা মাত্রায়। দুঃখ-আঘাতে বার বার পর্যুদস্ত কিন্তু ঘোর বিপদ-মাঝেও তিনি জননীর মুখের হাসি দেখে নিজে বার বার হেসেছেন। একটি জাতির স্থায়ী হাসির ঠিকানা হিসেবে গড়ে দিয়েছেন একটি স্বাধীন আবাসভূমি। এই সাধক প্রেমিক ‘কাহার সন্ধানে সকল সুখে আগুন জ্বেলে’ বেড়িয়েছেন তাঁর জবাব দিয়েছেন নিজের জবানিতেই। বলছেন: কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেই করি না। দিনরাত রিলিফের কাজ করে কুল পাই না। আব্বা আমাকে এ সময় একটা কথা বলেছিলেন: বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ ‘sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না। এ কথা কোনদিন আমি ভুলি নাই। [বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ ২১]।

 

বাবার একলাইনের দর্শনই তাঁর জীবন দর্শন। সাধক, প্রেমিকরা নিজের ভাবাদর্শে পাগল। আমাদের এই সাধক প্রেমিকও তা থেকে ব্যতিক্রম নয়। মাত্র ৫৪ বছর বয়সের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, এই সাধক, যা তার মোট জীবনের সিকিভাগ। এই জেল কোন অপকর্মের জন্য নয়; তার ভাব দর্শনের জন্যই। কারণ শাসকচক্র দেশ আর মানুষের জন্য এই সাধকের প্রেমকেই গণ্য করেছিল অপরাধ হিসেবে। তিনি হাসিমুখে বরণ করেছেন সবকিছু।

 

তাঁর এই দর্শনের ব্যাখ্যা কি? যাদের জন্য তাঁর প্রেম তাদের জন্যই তাঁর সবটুকু চাওয়া। তিনি অবলীলায় বলেন: আমি কী চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে খাক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক।/ আমি কী চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক।/ আমি কী চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।’ নিজের প্রশ্ন ও জবাবে তিনি নিজেই বলছেন, তিনি মানুষের জন্য কি চান, আবার বলছেন একটি স্থায়ী আবাস, সোনার বাংলার কথা। এই সোনার বাংলাই তার আজন্মের সাধনা। এই বাংলা ও বাংলার মানুষের জন্য ভালোবাসাই জীবনভর তাকে ‘ব্যাকুল করে এবং কাঁদায়’। তাইতো নিজের সম্পর্কে তিনি অবলীলায় বলেন : আমি মারা গেলে আমার কবরে একটা চোঙ্গা রেখে দিস। লোকে জানবে এই একটা লোক একটা টিনের চোঙ্গা হাতে নিয়ে রাজনীতিতে এসেছিল এবং সারাজীবন সেই টিনের চোঙ্গায় বাঙ্গালি বাঙ্গালি বলে চিৎকার করতে করতেই মারা গেল।’

 

এই সাধক কবি নন; day should কিন্তু তিনি দেখতে পান দূর ভবিষ্যৎ। একজন ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতই তিনি বলেন: ‘… জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি- আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির ‘পূর্ব পাকিস্তানে’র পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’  (৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯)। কেমন নিশ্চিত করে একজন এমনটি বলতে পারেন? পারেন, একজন সাধক তাঁর সাধনার শীর্ষচূড়ায় নিজেতে নিজে বিলীন হন যখন, তখন বুঝি স্বপ্নকে বাস্তবে দেখেন তারা। এই ‘বাংলাদেশ’কে তিনি দেখেন সেই ছাত্রজীবন থেকে। পরে তাঁর সাধনায় এই বাংলাদেশ ক্রমশ: পূর্ণ রূপ পায়। যে দেশটির জন্মই হয় নাই সেই দেশটির জাতীয় সঙ্গীত চূড়ান্ত করেন, দেশটি গড়তে মেধাবী তরুণদের উদ্দীপ্ত করেন, এমনকি চূড়ান্ত আঘাতের আগেও তিনি বলেন: ‘কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’। নিজের সাধনার ফল লাভে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ও নিশ্চিত তিনি। আমাদের সাধক নিশ্চিত তাঁর সাধনা বিফলে যেতে পারে না।

 

তারপর অনেক কান্না, অনেক রক্ত, অনেক আর্তনাদ ছাপিয়ে মূর্ত হয় অনেক সাধনার ধন। স্বাধীনতা আসে বিজয়ের হাত ধরে। কিন্তু সাধক প্রেমিকের সাথে পূর্ণ মিলন ছাড়া এই পাওয়াতো অর্থহীন। কিন্তু বুঝি তার ‘ভাবনা কিছু নাই’ কারণ কে যে তার সাথের সাথি তাই নিয়ে ভাবার আগেই দেখি : এই সাধক খেলছেন বিশ্ব লয়ে। তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক উচ্চতার নেতা, যাকে কুর্ণিশ করে গোটা বিশ্ব। পরাজিত গোষ্ঠীর কুৎসিত কারাগারের সাধ্য কি তাকে আটকে রাখে? হিমালয় না দেখার অতৃপ্তি মেটে যাকে দেখে, তাকে ধারণ করার শক্তি কার? আমাদের এই সাধক ফিরেন তাদের কাছেই যাদের সঙ্গে তার প্রেমময় অটুট বন্ধন। তাঁর এই প্রেমের শক্তির বর্ণনা দেন অপূর্ব ভাষায়: ‘আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমি দেশের মানুষকে ভালোবাসি, আর আমার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমি তাদেরকে খুব বেশি ভালোবাসি।’ নিজের প্রেম বা ভালোবাসার এমন গভীরতর ব্যাখ্যা আর কোনো সাধক এমনভাবে দিতে পেরেছেন? জানা নেই। সাধনার স্বপ্নের দেশে তিনি ফিরলেন, তিনি যাদের প্রেমের আরাধ্য সেই মানুষের কাছে তিনি ফিরলেন, তার সাধনার রূপ তিনি প্রকাশ করলেন : আমি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিতে চাই যে, আমাদের দেশ হবে গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দেশ। এদেশে কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সবাই সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে। (১০ জানুয়ারি ১৯৭২) এই সাধক এমন সাধক যিনি নিজেই নিজের মতো করে পথ তৈরি করে নিয়েছেন। বলেছেন : …অনেক সময় থিওরি ও প্র্যাকটিসে গণ্ডগোল হয়ে যায়। থিওরি খুব ভালো। কাগজে কলমে লেখা থিওরি অনেক মূল্যবান। পড়ে শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল কাজের সঙ্গে মিল না থাকলে থিওরি কাগজে-কলমে পড়ে থাকে, কাজে পরিণত হয় না (১৮.১.৭৪)।

 

প্রেমিক যিনি তিনি শুধু ভালোবাসেন না; ভালোবাসা চান-পানও। সব প্রেমিকই ভালোবাসার কাঙ্গাল। আমাদের এই প্রেমিক নিজেই বলেন: .. ‘আমি মাঝে মাঝে বলি যে, গেছি চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে গেছি সেখানে-বেতবুনিয়া; সে গ্রামের মধ্যে লক্ষ লক্ষ লোক দুই পাশে বসে আছেন, ওরা এসেছেন আমাকে দেখার জন্য। মনে মনে আমি বলি যে, আমি কি করেছি ওদের জন্য? আমার দুঃখ হয়, স্টিল দে লাভ মি। দুনিয়ার নিয়মই এই। ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতে হয় এবং সে ভালোবাসা সিনসিয়ারলি হওয়া দরকার। তার মধ্যে যেন কোনো খুঁত না থাকে। ইফ ইউ ক্যান লাভ সামবডি সিনসিয়ারলি, ইউ উইল গেট দ্য লাভ সামবডি। দেয়ার ইজ নো ডাউট এবাউট ইট। আমার জীবনে আমি দেখেছি, লাখ লাখ লোক দুপাশ দিয়ে কি অবস্থার মধ্যে- আমিতো কল্পনাও করতে পারি না। হোয়াই দে লাভ মি সো মাচ? ‘জবাবটা দিয়েছেন নিজেই ‘আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ করি, মবিলাইজ দ্য পিপল এন্ড ডু গুড টু দ্য হিউম্যান বিয়িংস অব বাংলাদেশ। দিজ আনফরচুনেট পিপল সাফার্ড লং- জেনারেশন আফটার জেনারেশন। এদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, এদের খাবার দিতে হবে (১৯.০৬.১৯৭৫)।

 

বাঙ্গালীর শতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির আকাশ স্পর্শী এই সাধক ও প্রেমিক পুরুষের নাম শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে তুলনা করা যায় এমন আর কাউকেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু এই ভাষণটি দেয়ার পর দুই মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই উজাড় করে ভালোবাসা দেয়ার, ভালোবাসার কাঙ্গাল এই সাধক, প্রেমিককে আমরা উপহার দেই ১৮টি বুলেট! হায়! হতভাগা বাংলাদেশ! তবে নিশ্চিত জানি, কায়মনে বাঙ্গালী, কিন্তু এই জন্মশতবর্ষে বিশ্বমানবের আসনে অধিষ্ঠিত আমাদের এই সাধক, এই প্রেমিক শেখ মুজিব, মরণ ভুলে অনন্ত প্রাণসাগরে আনন্দে ভাসছেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023