ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মাসে ৪ মামলা করছেন সরকারি লোকজন

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
  • আপডেট সময় শনিবার, ১৪ জানুয়ারী, ২০২৩

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সমাজে ভয়ের আবহ তৈরি হয়েছে, মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতি মাসে সরকারি লোকজন গড়ে চারটি করে মামলা করছেন এ আইনে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগই বেশি।

শনিবার (১৪ জানুয়ারি) সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘কী ঘটছে: বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮-এর ব্যবহারপ্রবণতা ও নিদর্শন’ শীর্ষক ওয়েবিনারের আলোচকেরা এসব মত তুলে ধরেন।

 

এতে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক ও সিজিএসের উপদেষ্টা আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ভীতির পরিবেশ তৈরি করাই ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন সবাই সার্বক্ষণিক আতঙ্কে থাকেন, প্রতিবাদ না করেন।

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। প্রয়োজনে ১৫ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ৭৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ে না। অভিযুক্তরা বিচারের আগেই দীর্ঘদিন আটক থাকছেন।

আলী রীয়াজ বলেন, গত ৪ বছরে ১৮ বছরের কম বয়সী অন্তত ২৬ কিশোর এ আইনে অভিযুক্ত হয়েছে। এ আইনের অধীন চার বছরে এক হাজার ১০৯টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলায় অভিযুক্ত দুই হাজার ৮৮৯ জন। এর মধ্যে আটক হয়েছেন এক হাজার ১১৯ জন। অর্থাৎ মোট অভিযুক্তদের ৩৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ আটক হয়েছেন। এ তথ্য মামলার পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলার তথ্য প্রকাশ করতে চায় না।

 

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হওয়া মামলায় এক হাজার ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় জানা গেছে। এর মধ্যে ৩০১ জন রাজনীতিবিদ। সাংবাদিক রয়েছেন ২৮০ জন, শিক্ষার্থী ১০৬ জন ও শিক্ষক আছেন ৫১ জন। তবে অভিযুক্ত অন্যদের চেয়ে শিক্ষার্থীদের আটকের হার বেশি। মোট অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭১ শতাংশই আটক হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তির অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ১৪০টি। এসব মামলায় অভিযুক্ত ২১০ জন। এর মধ্যে আটক হয়েছেন ১১৫ জন।

 

ওয়েবিনারে অন্য আলোচকরা বলেন, মাসে গড়ে ৯টি মামলা হয়েছে ফেসবুকে মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে। মোট ৬৯৮টি মামলা হয়েছে ফেসবুককেন্দ্রিক। এর মধ্যে হয়রানির মামলা ৭৬টি, আর্থিক প্রতারণা ৪৪টি এবং ধর্মীয় অবমাননার ১১৫টি মামলা। বাকি ৪৬৩টি রাজনৈতিক মামলা বলেই প্রতীয়মান হয়।

 

ওয়েবিনার সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের যে সংকট রয়েছে, তা এ আইনের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। এ আইন বাতিল করতে হবে, সবাই সেই কথা বলছেন। দেশে দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি আছে, সেটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এ আইন। অনেকেই মনে করেন এ আইনের মাধ্যমে শুধুমাত্র গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এ আইনের মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার, চিন্তার স্বাধীনতা প্রকাশকে খর্ব করেছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এলিনা খান বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এক সময় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারার অপব্যবহার হয়েছে, সেটারই নতুন আকার পেয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।

সভাপতির বক্তব্যে সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ভয় সৃষ্টিতে সফল হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। রাজনৈতিকভাবে যারা শক্তিশালী, তাদের বিরুদ্ধে এ আইনের প্রয়োগ দেখা যায় না।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023