ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনে নামছে বিএনপি ও সমমান দলগুলো। আন্দোলন সমন্বয় করতে একটা লিয়াজোঁ কমিটি করা হবে। এই কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হবে আন্দোলন। ইতোমধ্যে লিয়াজোঁ কমিটির গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কমিটি গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই লিয়াজোঁ কমিটির ঘোষণা আসবে বলে জানা গেছে। লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের ব্যাপারে ৩০টির অধিক দলের সঙ্গে বিএনপি যোগাযোগ করেছে। বিএনপি বলছে, সরকার হঠানোর আন্দোলনে রাজপথে থাকা প্রতিটি দল নিয়ে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হবে।
জানা যায়, লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের ব্যাপারে গত ১১ ডিসেম্বর বিএনপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা আলোচনা করেন। ওই আলোচনায় লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটিতে উভয় পক্ষের সাত জন করে প্রতিনিধি থাকবেন। তবে কমিটি ছোট রাখার ব্যাপারে জোর দিয়েছে বিএনপি। বেশি বড় কমিটি হলে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয় বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ এর সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান ইমন বলেন, লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের ব্যাপারে সবাই একমত হয়েছে। তবে এখনো এর চূড়ান্ত রূপরেখা হয়নি। যুগপৎ আন্দোলন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের একটা লিয়াজোঁ কমিটি থাকবে। তবে ২০ দল, ঐক্যফন্ট বা জামায়াতের সঙ্গে আমাদের লিয়াজোঁ কমিটির ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। তাদের সঙ্গে বিএনপি কী করেছে, তা জানি না। তবে যুগপৎ আন্দোলন বলতে সবাইকেই বোঝায়, কাউকে বাদ রেখে না।
তিনি বলেন, লিয়াজোঁ কমিটিতে গণতন্ত্র মঞ্চের প্রতিনিধি হিসেবে দুইজনকে থাকতে বলেছিলো বিএনপি। গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে তিনজন অথবা চারজন থাকার কথা বলা হয়েছে।
কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, লিয়াজোঁ কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে ঘোষণা আসতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, সব রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ১০–১৫ জনের একটা কমিটি হবে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে কর্মসূচি দেয়া, কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য প্রোয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা, আন্দোলনরত সবার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, কারো সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি যাতে না হয়– এসব সমন্বয় করাই হবে লিয়াজোঁ কমিটির কাজ। তিনি বলেন, একটা মিটিংয়ের মাধ্যমে লিয়াজোঁ কমিটির ব্যাপার জানতে পেরেছি। কিন্তু এর গঠন প্রণালী বা কাদের নিয়ে গঠিত হবে এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, লিয়াজোঁ কমিটি এখনো আলোচনা পর্যায়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। আগামী ২৪ ডিসেম্বরের আগেই এ ঘোষণা আসতে পারে। লিয়াজোঁ কমিটির আকার এখনো ঠিক হয়নি। তবে এটি ৫ থেকে ১০ সদস্যের হতে পারে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র মঞ্চ, ইসলামিক দল, কমিউনিস্ট পার্টিসহ যারা আন্দোলনের সঙ্গে দলগতভাবে অথবা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে থাকবে– তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ কমিটির যোগাযোগ থাকবে। জামায়াত যদি এই আন্দোলনে থাকতে চায় তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি থাকবে না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, লিয়াজোঁ কমিটি গঠন প্রক্রিয়াধীন, এখোন চূড়ান্ত হয়নি। তবে খুব শিগগিরই এর ঘোষণা আসবে।
যারা যারা থাকছে যুগপৎ আন্দোলনে
যুগপৎ আন্দোলনে গণতন্ত্র মঞ্চের সাত দলের মধ্যে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, কমরেড সাইফুল হকের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি আন্দোলন, ড. রেজা কিবরিয়া ও সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নূরের গণঅধিকার পরিষদ, শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন রয়েছে।
২০ দলীয় জোটের অন্য দলগুলো হলো– কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, শাহাদাত হোসেন সেলিমের নেতৃত্বাধীন বিএলডিপি, ড. ফরিদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পার্টি–এনপিপি, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশ জাতীয় দল, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, জাগপা, ন্যাশনাল পার্টি (ন্যাপ–ভাসানী), সাম্যবাদী দল, ডেমোক্রেটিক লীগ, ইসলামিক পার্টি, এনডিপি, পিপলস লীগ, মাইনরিটি পার্টি, জাগপা (অপরাংশ) রয়েছে।
এ ছাড়া রয়েছে ২০ দলীয় জোট থেকে এক সময় বেরিয়ে যাওয়া ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি–বিজেপি এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টুর নেতৃত্বাধীন গণফোরাম। এর বাইরে আরও কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করছে বিএনপি। এর মধ্যে বাম ঘরানা এবং ইসলামী দলও রয়েছে। এসব দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়েছে। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে ইসলামী দলগুলোর অনেককেই যুগপৎ আন্দোলনে পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন বিএনপির নেতারা।