শিরোনাম :

একজন শেখ হাসিনা এবং আমরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় রবিবার, ৮ আগস্ট, ২০২১

ডেস্ক রিপোর্ট

সারা বিশ্বে চিত্রজগত বড়ই বিচিত্র। সম্প্রতি পরীমনি নামক একজন অন্যতম শীর্ষ মডেল কাম চিত্রনায়িকার গ্রেফতার নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছে। করোনা এবং ডেঙ্গুর প্রভাব ছাড়াও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দুর্ভোগ আমরা মোকাবিলা করছি। শোকের মাস এই আগস্টের শুরু থেকেই মিডিয়াগুলো পরীমনিদের অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে অতিরিক্ত মাতামাতিতে ব্যস্ত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বর্তমানে এটাই আমাদের মেজর ন্যাশনাল ক্রাইসিস। বাংলাদেশে যে এতগুলো প্রাইভেট ক্লাব আছে, যেখানে ‘খুল্লাম খুল্লা পেয়ার কারেঙ্গে হাম্ দোনো’ স্টাইলের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

 

আসলে সব দেশেই, সব সংস্কৃতিতেই রাতের অন্ধকারে অনেক ধরনের খেলা চলে। অনেক বড় বড় অফিসার থেকে শুরু করে ধনী ও প্রভাবশালীদের মধ্যে কিছু শারীরিক ক্ষুধা, চাহিদা থাকে। সেটা তারা রাতের আঁধারে চরিতার্থ করতে চায় বিভিন্ন রকম পরিবেশে। এটা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও হয়। সম্প্রতি শিল্পা শেঠির স্বামী রাজ কুন্দ্রাকে নিয়ে যে কাণ্ড হলো, সেটা হিমবাহের উপরিভাগ মাত্র। ধরা পড়লে ওটুকুই কেবল দেখা যায়, আড়ালে থেকে যায় সিংহভাগ। আবার ধরা পড়ার চেয়ে ধরা না পড়া ঘটনাও অনেক বেশি। পাঠক শুধু জানতে পারেন কোনো ঘটনায় কেউ ধরা পড়ার পর।

 

এ দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, আবার এটা ধর্মনিরপেক্ষ দেশও বটে। এখানে মেয়েদের তিন ক্লাসের পর আর পড়ালেখা করা উচিত নয় বলে নানান জায়গায় প্রচার করা হয়, ধর্ষণের অজুহাত হিসেবে পোশাকের কথা বলা হয়, আবার ছোট্ট শিশুরাও এখানে ধর্ষণের শিকার হয়। নারীদের নিষ্পেষণের জন্য এক ভয়ংকর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এটা। আবার এসব কিছু মেনেই আমাদের এত এত ক্লাব আছে, তারা লাইসেন্স পায়, সেখানে মদোৎসবও চলে।

 

পুরুষের পকেটে অতিরিক্ত অর্থ হলে তাকে যেন জাতে উঠতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ক্লাবে যেতে হবে, মদ খেতে হবে, টেনিস কিংবা গলফ খেলতে হবে, কিছু পরকীয়া করতে হবে, কিছু নারী সঙ্গিনী থাকতে হবে এবং তাকে ডিসকো পার্টিতেও যেতে হবে। এগুলো যেন সমাজের উচ্চবিত্তের স্ট্যাটাস সিম্বল। সেই সঙ্গে অর্থবান পুরুষদের বউকে সুন্দরী হতে হবে এবং তাদের শরীরের কিছু অংশ দেখানোর মতো বিশেষ ডিজাইনের পোশাকও পরতে হবে। তাদের কথা বলতে হবে অর্ধেক ইংরেজির সঙ্গে অর্ধেক বাংলা মিশিয়ে। এবং আজকাল এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ‘দামি ডিজাইনার’স্’ ব্যাগ, জুতা, ঘড়ি, ব্রেসলেট—যেসবের দাম হাজার হাজার ডলার। সুতরাং পরীমনিরাই শুধু পাপ করে না, তাদের কাছে যারা যায়, যদি পাপ হয়েই থাকে, তারাও সেই পাপের ভাগিদার। কিন্তু আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অপরাধ দেখা হয় একপাক্ষিকভাবে, নারীদের দিক থেকে। অর্থনীতির নিয়মে ডিমান্ড থাকলে তো সাপ্লাই থাকবেই। ডিমান্ড যারা তৈরি করছে, তারাই তো আসল কুশীলব। অথচ আমরা কেবল সাপ্লাই দেখছি, ডিমান্ড দেখছি না। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে যুগে যুগে বড় বড় দেশে বড় বড় লোকের মধ্যে এমন ডিমান্ড ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।

 

একটা বিষয় আমরা মেলাতে পারি না যে, কেবল শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে কেউ কেউ এত অর্থবিত্তের মালিক হন কী করে? কারণ, কোনো ব্যবসাতেই নিয়ম মেনে ট্যাক্স দিয়ে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিয়ে এত অল্প সময়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করা যায় না। আমাদের দেশে কিছু কিছু ব্যবসায়ী এতই বিত্তশালী যে, তারা রাতারাতি পুরো প্লেন ভাড়া করে বিদেশে উড়ে যেতে পারেন, বিদেশ থেকে আস্ত হাসপাতাল উড়িয়ে নিয়ে আসতে পারেন। ব্যবসায় তো আলাদিনের চেরাগ নেই। বরং ব্যবসার একটি সিস্টেম আছে। যেখানে জবাবদিহি থাকে, ব্যাংক ঋণ থাকে, নিয়মিত কিস্তি শোধ করার ব্যাপার থাকে।

 

বর্তমানে করোনার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনোক্রমে বেঁচেবর্তে আছে, হাজার হাজার মানুষের চাকরি চলে গেছে। এখন সারা বিশ্বে সবচাইতে জমজমাট আয়ের জায়গা হলো অনলাইন-ভিত্তিক ব্যবসা। কিন্তু আমাদের দেশে তৈরি পোশাকশিল্প এখনো সবচাইতে বেশি রেমিট্যান্স এনে দিচ্ছে। এজন্য সরকার এদেরই সব ধরনের সুবিধা দিচ্ছে। এরা যেহেতু সবচাইতে বেশি রেভিনিউ দেয় এবং বর্তমানে সংসদেও এদের সংখ্যা বেশি, সে কারণে ব্যবসায়ীদের পক্ষেই বিভিন্ন সুবিধা আইন-নীতিমালা তৈরি করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। এখন তো পলিটিক্স আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই, বিজনেসম্যানদের হাতে চলে গেছে, এটা হয়ে গেছে বিজনেসটিক্স। অথচ এককালে ব্যবসায়ীদের খুব একটা সম্মানের চোখে দেখা হতো না। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম, ব্যবসায়ীদের হেয় করে বলা হতো, আরে ওরা বেনিয়া। বেনিয়ারা তাদের বাচ্চাকে ছোটবেলা থেকে গদিতে বসিয়ে দিত। গুজরাটি কিংবা মারোয়াড়িরা ছিল বেনিয়া, তারা শুধু পয়সা চিনত। কিন্তু বাঙালি সব সময় মূল্যবোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, আদর্শ নিয়ে কথা বলেছে। সেই বাঙালিই আজ ব্যবসায়ী জাতিতে পরিণত হয়েছে। খুব ভালো কথা।

 

বাংলাদেশে জিডিপি বেড়েছে। কোনো কোনো বড় ব্যবসায়ী যুক্তরাষ্ট্রে চার দফায় রোড শো করেছেন। সেখান গিয়ে বলছেন, এসো আমাদের দেশে, বিনিয়োগ করো। কিন্তু সত্যি কি করোনার এই মহামারির মধ্যে আমাদের দেশে এখন কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে? এমনিতেই কাজ হারিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্বিষহ অবস্থা, তার ওপর নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু শহর নয়, গ্রামীণ এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার এখন ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই অবস্থায় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, করোনার জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আগে মানুষের জীবিকা নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল, সেটি করা হয়নি। যত দিন করোনা থাকবে, তত দিন দেশে বিনিয়োগ হবে না—এটা নিশ্চিত। তাই কর্মসংস্থান তৈরি করাও কঠিন। এজন্য অনেকের মতো আমিও মনে করি, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

 

এখন দেখা যাচ্ছে, আমরা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়ার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করছি, বিনিয়োগের জন্য রোড শো করে বলছি—দেখো, আমাদের দেশে অনেক ক্লাব আছে, বিনোদনের ব্যবস্থা আছে, প্রচুর বিদ্যুৎ তৈরির অবকাঠামো আছে, আমাদের জমি আছে, রাস্তাঘাট আছে… ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এর পরের চিত্রটা আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? হঠাতই বলা হলো, ১ আগস্ট থেকে শ্রমিকদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে, লকডাউন রেখেই এই নির্দেশ জারি করা হলো, অথচ তাদের যাতায়াতের জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থা করা হলো না। এর আগে ঈদ করতে সপ্তাখানেকের জন্য সবকিছু খুলে দেওয়া হলো। জানা গেল, ঈদে ঢাকা ছেড়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ সিম ব্যবহারকারী মানুষ। এদের সিংহভাগ ঢাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানায় চাকরি করেন। এরা ৮-১০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি বাঁচাতে জীবন বাজি রেখে ৫-১০ গুণ অর্থ ব্যয় করে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে নরকযন্ত্রণা সইতে সইতে ঢাকায় ফিরতে শুরু করলেন!

 

এটা রীতিমতো ফাঁদ। প্রায় কোটি মানুষকে করোনার ভেতরে একবার গ্রামে যেতে দিয়ে আবার হঠাৎ নোটিশে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার ফাঁদ। প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে করোনা ছড়াতে ছড়াতে তারা একবার ঢাকা ছাড়লেন এবং প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে লঞ্চে বাদুড়ের মতো ঝুলে, লেগুনায়, ট্রাকে পশুর মতো ঠাসাঠাসি করে তারা ঢাকায় ফিরলেন। এসব দৃশ্য দেখে আমার কেবল মনে হচ্ছিল, আমরা উন্নত জাতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছি, মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার মহাসড়কে উঠতে চাইছি, বিনিয়োগের জন্য রোড শো করছি—কিন্তু আমরা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি।

 

যারা বাদুড়ঝোলা হয়ে ঢাকায় ফিরলেন, এই দরিদ্র মানুষগুলোর সঙ্গে আমরা কি জানোয়ারে মতো ব্যবহার করছি না? আমাদের সরকারের যেসব মন্ত্রণালয়ের জ্ঞানী কর্মকর্তারা এসব আদেশ-নির্দেশ দিচ্ছেন—এরা কি ভিনগ্রহের মানুষ? এদের জন্ম কি এই দেশে হয়নি? এরা কি এসব গরিবের দুর্ভোগের কথা কখনো সংবেদনশীল মনে ভাবতে পারেন না? এদের মন কি মরে গেছে? এরা কি মানুষ না? সব রোবট? কী করে একটা সরকারের মধ্যে এত সমন্বয়হীন ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকে? এমনকি ন্যূনতম সচেতনতা হিসেবে পাবলিকের মুখে মাস্ক পরার বিষয়টিও আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না। তার মানে হলো, আমাদের বিপুল জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবকাঠামো ও পরিকল্পনা আমাদের নেই। সর্বত্র এই সমন্বয়হীনতা দৃশ্যমান। আর সমন্বয়হীনতা আছে বলেই শেখ হাসিনা যত জায়গায় যত ধরনের সহায়তা দিচ্ছেন, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বৃথা যাচ্ছে। আমার ভয় হচ্ছে, এই দেশে শেখ হাসিনার মতো অসাধারণ এক নেতা পেয়েও ব্যক্তিস্বার্থবাজ কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনায় এবং কিছু কর্মকর্তার উদ্ভট কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনার অন্তঃস্থ শক্তি যেন শুষে নেওয়া হচ্ছে! আমরা এত স্বার্থপর হয়ে গেছি যে, আওয়ামী লীগের নামে কেউ ভেতরে ভেতরে জামায়াত, হেফাজত, পাকিস্তানি মানসিকতা লালন করছি। শেখ হাসিনাকে তাঁর ভাই কামালের জন্য কাঁদতে দেখেছি, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, হাসিনা কেবল ভাইয়ের জন্য কাঁদছেন না, তিনি নিজের অসহায়ত্বে কাঁদছেন, সারা দেশের মানুষের জন্য কাঁদছেন।

 

সবকিছু হারিয়ে শেখ হাসিনা বাঙালি জাতিকে পথ দেখানোর জন্য দিনরাত কাজ করছেন, কিন্তু এ জাতি যেন পথ দেখতে চায় না, এ জাতি যেন অন্ধ হয়ে গেছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023