বগুড়ার প্রবীন শিল্পপতি আলহাজ সেখ সরিফ উদ্দীনের পারিবারিক প্রথা ভঙ্গ করে উনারই স্ত্রী দেলওয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর প্রথা ভেংগে গোপনে দাফন করা নিয়ে বগুড়াবাসী এবং ওই শিল্পপতি পরিবারের সদস্যদের মাঝে অনেক প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের ধারণা মরহুমার সম্পত্তি হাতিয়ে নিতেই কি লুকোচুরি এবং গোপনে দাফন সম্পন্ন করা? অনেকেরই অভিমত রহস্যজনক এই মৃত্যুর গভীরে গিয়ে গোপনে দাফনের বিষয়টি পুলিশী তদন্তে আসা প্রয়োজন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিল্পপতি আলহাজ্ব সেখ সরিফ উদ্দীনের পরিবারে কেউ মারা গেলে কাটনারপাড়া, বড়গোলা, বাদুরতলা নামাজ গড় এবং তাদের মালিকানাধীন বিড়ি ফ্যাক্টরীর শত শত শ্রমিক, অন্য প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীসহ শহরবাসীদের শেষ দেখা দেখাতে মেয়েদের এবং ছেলেদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরিবারের সদস্যরা যতক্ষণ পর্যন্ত না আসবে ততক্ষণ লাশ দাফন করা হয় না। মরহুম আলহাজ সেখ সরিফ উদ্দীনের মৃত্যুর পরও দেখা গেছে এমন দৃশ্য। কিন্তু উনারই স্ত্রী দেলওয়ারা বেগমের মৃত্যুর পর লুকোচুরি কেন করা হলো? এতে বিস্মিত বগুড়াবাসী, উনার কর্মচারী এবং কিছু স্বজন। এমনকি দেলওয়ারা বেগমের সাথে পরিচিত ব্যাবসায়ীদেরও জানানো হয়নি। এর পিছনের কাহিনি কি? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসীর কয়েকজন জানাল, বুধবার দিবাগত রাতে দেলওয়ারা বেওয়ার মৃত্যু হলেও দাফনের পুর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত কাউকে লাশ দেখতে দেওয়া হয়নি। এমনকি তার বড় মেয়ে, জামাইসহ আত্মীয় স্বজনদেরও দেখতে দেওয়া হয়নি। লোক মুখে খবর পেয়ে বড় মেয়ে, জামাই লাশ দেখার জন্য সরিফ বিড়ি ফ্যাক্টরীতে গেলে দরজা বন্ধ রেখে অন্য মেয়ে, জামাই, নাতিরা অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়। এমনকি তার প্রতিষ্ঠিত চারমাথাস্থ সরিফ সিএনজি, সরিফ বিড়ি ফ্যাক্টরীও বন্ধ রাখা হয়নি। দেলওয়ারা বেগমকে শত শত মহিলা শ্রমিকরা শেষ দেখা দেখতে পারেনি। দেখতে না পেরে বিড়ি ফ্যাক্টরীর বেশ কিছু মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানালেন, কেন এমন করা হল ? আমরাতো শ্রমিক, মালিককে শেষ দেখা দেখতে পাবো না? আত্মীয়রা কেউ কেউ সম্পত্তি হাতিয়ে নিতেই এমন করেছে বলে ধারনা তাদের। শহরের সাংবাদিক, সামাজিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী কাউকেই দেলওয়ারা বেগমের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। যেমনটি জেনেছিল শিল্পপতি আলহাজ্ব সেখ সরিফ উদ্দীনের মৃত্যুর পর। দেলওয়ারা বেগমের মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম জানান, আমার মায়ের মৃত্যুর খবর আত্মীয়স্বজন কাউকে জানানো হয়নি। আমার গর্ভধারীনি মায়ের মুখটাও ওরা দেখতে দিলো না। আমার মায়ের স্বাভাবিক মৃত্যু না অন্য কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তবে আমার মায়ের মৃত্যুর কারণ এখন পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে।সরিফ বিড়ি ফ্যাক্টরীর এক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেলওয়ারা বেগমকে তার মেয়ে, জামাই, নাতিরা জিম্মি করে রেখেছিল। প্রায় ২ বছর যাবত দেলওয়ারা বেগমকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এর আগে দেলওয়ারা বেগম ইচ্ছেমতো চলাফেরা, বিদেশভ্রমন সবই করতেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের শেষের দিকে মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম ও তার স্বামীর সঙ্গে অন্য মেয়ে জামাইদের দ্বন্দ্ব বাধে। এতে করে ৪ মেয়ে একদিকে অবস্থান নেয়। তখন আকিলা সরিফা সুলতানা খানম ও তার স্বামীর সঙ্গে তারা দেলওয়ারা বেগমের দুরুত্ব তৈরি করে। যা শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ একাধিক মামলায় জড়িয়ে পড়ে। তার পর থেকে দেলওয়ারা বেগমের অদ্যবধি মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম ও তার স্বামীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাত হয়নি। তবে মৃত্যুর আগে দেলওয়ারা বেগম তার মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম ও তার স্বামীর সঙ্গে দেখা করানোর জন্য এবং উভয়পক্ষের মামলাগুলো আপোষ করতে অন্য মেয়ে জামাইদের চাপ দিতো। তখন মেয়ে জামাইরা দেলওয়ারা বেগমকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতো। দেলওয়ারা বেগমের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, দেলওয়ারা বেগম মৃত্যুর কয়েক মাস আগে থেকে মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার করার জন্য বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলেছেন।এ নিয়েও দেলওয়ারা বেগমের অন্য মেয়ে, জামাই ও নাতিরা বিভিন্নভাবে অপমান করেছে। সূত্রটি আরো জানায়, দেলওয়ারা বেগমের মৃত্যুর আগে অন্য মেয়ে, জামাই, নাতিরা তার সকল সম্পদ তাদের নামে লিখে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল।কিন্তু দেলওয়ারা বেগম কাউকে কোনো সম্পদ লিখে দিবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।তখন দেলওয়ারা বেগমের সকল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তারা কেড়ে নেয়। এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই ঝগড়া, বিবাদ লেগেই থাকতো। তবে দেলওয়ারা বেগমের মৃত্যুর খবর গোপন রাখার চেষ্টা, আত্মীয় স্বজনদের খবর না দেওয়া, মৃত্যুর দিনেও তার সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখা, মৃত্যুর পর মেয়ে আকিলা সরিফা সুলতানা খানম, এলাকাবাসী, ব্যবসায়ীমহল, শহরবাসী, গণমাধ্যমসহ সবাইকে না জানানো এটি এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বগুড়া শহরের একজন শিল্পপতির মৃত্যু ঘটনা ধামাচাপা কেনো দিতে হবে? এ রকম অসংখ্য প্রশ্ন নিয়ে শহর জুড়ে গুঞ্জন চলছে।