সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় সোমবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মিয়ানমার সীমান্তে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব বাহিনী ও সংস্থা সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তবে এখনই মিয়ানমার সীমান্তে সেনা মোতায়েনের কথা ভাবছে না সরকার। বরং কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে সর্বোচ্চ সংযম দেখিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানে জোর দিতে চায় ঢাকা। অবশ্য সেনা মোতায়েন না হলেও সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে বিজিবিকে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ফোরামে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক কর্মকা- তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমার যে সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে, তার জবাব দিতে হবে কূটনৈতিকভাবে। কূটনৈতিক তৎপরতায় কাজ না হলে মিয়ানমারের ওপর শক্তি প্রয়োগ না করে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের মতো কৌশলী পথে হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রতিদিনই সংঘর্ষের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংকার থেকে ছোড়া গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে এপারে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু, বাইশাফাড়ি, রেজু গর্জনবনিয়া, আমতলিসহ পুরো সীমান্ত এলাকা। মাঝে মাঝেই

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গোলা, মর্টারশেল এসে পড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এমতাবস্থায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সীমান্তলাগোয়া বাংলাদেশিদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে মিয়ানমারের ছোড়া গুলিতে একজন নিহত ও ৬ জন আহতের ঘটনায় গতকাল মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সময় তার কাছে প্রতিবাদলিপি হস্তান্তর করা হয়। গত আগস্ট থেকে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো তাকে তলব করা হলো।

এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব খুরশেদ আলমের সভাপতিত্বে গতকাল অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ সরকারের সব গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে মিয়ানমারের কর্মকা-কে এখন পর্যন্ত উদ্দেশ্যমূলক নয় বলে মত দেয়া হয়। তবে আসলেই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা, তা অধিকতর যাচাই-বাছাই করে দেখার কথা জানানো হয়।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব খুরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা বলেছি এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটি কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটি মিয়ানমারকে চিন্তা করতে হবে। মিয়ানমারের গোলা যেন বাংলাদেশের ভূখ-ে না আসে, সেটি দেখার দায়িত্ব মিয়ানমারের। বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল এবং শান্তিকামী রাষ্ট্র। আমরা ধৈর্য ধরে এটি সহ্য করে যাচ্ছি। আমরা তাদের বলেছি, বিষয়টি সমাধান করুন; আমাদের এখানে যেন কোনো প্রাণহানি না হয়।’

খুরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা উচ্চপর্যায়ে একটি বৈঠক করেছি বাংলাদেশের সব এজেন্সিকে নিয়ে। বিজিবি এবং কোস্টগার্ডকে বলেছি সীমান্তে সজাগ থাকতে। সাগর দিয়ে রোহিঙ্গারা যেন ঢুকতে না পারে, সে বিষয়ে তাদের জানানো হয়েছে।’

বারবার প্রতিবাদলিপি দিয়েও কিছু হচ্ছে না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের করার কিছু নেই। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিবেশীকে যতটুকু করা সম্ভব, ততটুকু আমরা করছি। আমাদের বক্তব্যে কোনো দুর্বলতা নেই।’ তিনি বলেন, ‘আসিয়ান রাষ্ট্রদূতদের এ বিষয়ে জানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে আমরা তাদের বলতে পারি যে আমরা বারবার বলার পরেও মিয়ানমার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ভবিষ্যতে মিয়ানমারকে কীভাবে এ ধরনের কর্মকা- থেকে দূরে রাখা যায়, সেই চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের ফাঁদে পা না দিয়ে এখন পর্যন্ত সঠিক পথেই আছে বাংলাদেশ। তাদের মতে, নিজেদের স্বার্থেই সংঘাতে না জড়িয়ে অন্য সব বিকল্প পথেই খুঁজতে হবে সমাধান। এ জন্য নেপিদোর ওপর চাপ বাড়াতে চীন-ভারত ও আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়ানো যেতে পারে। জাতিসংঘেও বিষয়টি উঠানো দরকার। বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতির সঙ্গে সামরিক যে প্রস্তুতি বা প্রস্তাবগুলো আছে, সেগুলো জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ কূটনীতিরও বিভিন্ন পর্যায় আছে। এতে একটা পর্যায় হচ্ছে, আমাদের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা। তারা এ সংঘাত বন্ধ করার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু তাদের তেমন আগ্রহী দেখা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ  বলেন, ‘মিয়ানমার তো চাচ্ছেই যে তারা যা করছে আমরাও তাই করি। তাতে তারা তো খুশিই। কারণ ছোট কিছুতেও যদি একটা যুদ্ধ বাধে, তাতে তাদেরই লাভ। সেখানে আমাদের মাথা ঠাণ্ডা রাখা দরকার। আমরা জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, এটা ভালো দিক। এটা করা দরকার। যেহেতু মিয়ানমার ছোটখাটো একটা গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে, সুতরাং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এমনিতেই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। আমাদের দরকার হলো আন্তর্জাতিক ফোরামে এটা তোলা। আন্তর্জাতিক মহল তো চুপ হয়ে আছে। কোনো দেশ তো প্রতিবাদ করছে না। একই সঙ্গে আমি বলি, যেহেতু সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আছে মিয়ানমারে, সেটা বিবেচনায় নিয়ে বুঝেশুনে কূটনীতি চালাতে হবে। প্রয়োজনে সামরিক কূটনীতি চালাতে হবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশীদ  বলেন, প্রথম মূল্যায়ন হচ্ছে, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের ভূমিতে যাই এসে পড়–ক, তার দায় সম্পূর্ণ মিয়ানমার সরকারের। এটি আন্তজার্তিক সীমানা আইনের চরম লংঘন। আমরা তাদের ডেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তারা কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে, সেটি আমরা জানি না। সেখানে দুটি বিষয় আছে। উত্তম পন্থা হচ্ছে বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে সমাধান করা। বাংলাদেশ উত্তম পন্থাই ধরে আছে। এখন এটি যদি দ্বিপাক্ষিকভাবে সমাধান না হয়, তাহলে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে যেতে হবে। কিন্তু সেই কূটনীতি কতটুকু শুরু হয়েছে, সেটাও আমাদের জানা নেই।

তিনি বলেন, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। সেটিও একটি ভালো কূটনৈতিক দিক। সেটি যদি সফল না হয়, তাহলে আমাদের অন্য পথে হাঁটতে হবে। সে পথে হাঁটতে হলে আমাদের ঝুঁকিগুলো মাথায় রেখে বিচক্ষণতার সঙ্গে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে, যাতে যুদ্ধ এড়িয়ে আমরা সমস্যার সমাধান করতে পারি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করলেও সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে তাদের মধ্যে ভীতি প্রদর্শন করতে পারে। বাংলাদেশ যে সমীচীন জবাব দেবে, সে ব্যাপারেও একটা বার্তা দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023