তনু মিয়ার চোখে একরাতে বদলে যাওয়া জীবন

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট, ২০২২

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন তার দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে ছিলেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদূর জার্মানিতেও কেউ কেউ সহযোগিতার হাত তুলে নেন তাদের ওপর থেকে। কোনোরকম যোগাযোগ রাখাটাও তাদের অনেকের জন্য অস্বস্তির হয়ে ওঠে। কিন্তু ঠিক সেসময়ে তাদের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে আখেনে সীমান্তে পৌঁছে দেন গাড়িচালক তনু মিয়া। পরবর্তীতে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জার্মান প্রবাসী সরাফ আহমেদ। তার সঙ্গে তনু মিয়ার কী কথা হয়েছিল, তা তিনি জানিয়েছেন।

 

১৫ আগস্ট সকালে ব্রাসেলসের বাংলাদেশ দূতাবাসের গাড়িচালক তনু মিয়া রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের কাছ থেকে একটি ফোন পান। সানাউল হক সেই জন, যার বাসায় সেই রাতে বঙ্গবন্ধু কন্যারা ছিলেন। তিনি আর তাদের সেখানে রাখতে চাননি। তিনি তনু মিয়াকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন।

তনু মিয়া তার বন্ধু লন্ডনের কমনওয়েলথ কার্যালয়ে চাকরিরত কাজী সিরাজের কাছ থেকেও ফোন পান। যিনি তাকে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়ার কথা জানান।

সরাফ আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রদূতের ফোন পেয়ে উদ্বিগ্ন তনু মিয়া রওনা হন। পথে ভাবতে থাকেন, গত দুই দিন কত হাসিখুশিতে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের সঙ্গে সময় কাটলো। এখন তিনি এসব কী শুনলেন!

৩০ মিনিটের মধ্যেই রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে পৌঁছান তিনি। পৌঁছে দেখেন সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা হাজির। তাদের মধ্যে আছেন প্রথম সচিব খায়রুল আনাম, দ্বিতীয় সচিব জাহাঙ্গীর সাদাত, বাণিজ্য সচিব ও অন্যরা। তনু মিয়া লক্ষ্য করেন, রাষ্ট্রদূত টেলিফোনে নানা জনের সঙ্গে কথা বলছেন।

 

ঘটনার পরে কেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যারা জানতে চাইলে তনু মিয়া বলেছেন, সেদিনের রাতের আগে কার্লসরুয়েতে প্রথম দফায় থাকার দিনগুলোতে হাসিনা আপা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেশ উচ্ছ্বল। তাদের চোখে ছিল নতুন দেশে নতুন কিছু দেখার আনন্দ। কিন্তু কে ভেবেছিল এই আনন্দের রেশ অচিরেই মিলিয়ে যাবে।

তনু মিয়া লেখককে বলেন, তাদের দুঃখভরা মুখ দেখে ভেবেছিলাম, একরাতেই যদি কেউ তার পরিবারের সবাইকে হারিয়ে ফেলে তবে সেই অনুভূতি কেমন হয়। সেই অনুভূতি থেকেই আমি তাদের পাশে ছিলাম।

 

রাষ্ট্রদূত টেলিফোনে কথা শেষ করে তনু মিয়াকে বলেন, বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছেন এবং শিগগিরই তাকে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের নিয়ে জার্মানি-বেলজিয়াম সীমান্ত আখেনে রওনা হতে হবে। তিনি আরও বলেন, তাঁকে দূতাবাসের বাণিজ্য সচিবের টয়োটা গাড়িতে করে তাদের আখেনে পৌঁছে দিতে হবে।

 

এরপর তনু মিয়া রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে শেখ হাসিনাদের জন্য অপেক্ষায় থাকেন। তিনি মূলত দূতাবাসের প্রশস্ত ফরাসি সিট্রোন গাড়িটি চালাতেন।

ওই গাড়িতেই শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ওয়াজেদ মিয়া ডেনহাগ ও আমস্টারডাম গিয়েছিলেন। দূতাবাসের বাণিজ্য সচিবের টয়োটা গাড়িতে তাদের নিয়ে যেতে হবে শুনে তিনি বেশ অবাক হন।

সকাল সাড়ে দশটার দিকে রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের তৃতীয় তলা থেকে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ওয়াজেদ মিয়া নিচে নেমে আসেন। প্রথমে আসেন ওয়াজেদ মিয়া। হাতে একটি ছোট স্যুটকেস এবং জয় ও পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে। তার পেছনে নেমে আসেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

 

তনু মিয়া তাদের জিনিসপত্র গাড়ির পেছনে রাখেন। রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী ও মেয়েরা তাদের বিদায় জানান। এ সময় কান্নারত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে সান্ত্বনা দেন তারা।

কিছুক্ষণ পর তনু মিয়া ধূসর টয়োটা গাড়িটি নিয়ে আখেনের দিকে রওনা হন। গাড়িতে দুই শিশুসন্তান জয় ও পুতুলকে নিয়ে ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনা পেছনের আসনে বসেন। সামনের আসনে ডান দিকে বসেন শেখ রেহানা।

ব্রাসেলস থেকে জার্মানির সীমান্ত শহরের দূরত্ব প্রায় ১৪৫ কিলোমিটার। সারা রাস্তা শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা কাঁদতে থাকেন আর বারবার রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে থাকেন। ওয়াজেদ মিয়া মাঝেমধ্যে তাদের সান্ত্বনা দেন আর বলতে থাকেন, ‘হতে পারে আমরা যা শুনেছি তা পুরোপুরি সত্য নয়।’ তনু মিয়াও কয়েকবার বলেন, ‘আপা, আর কাঁদবেন না।’

 

বেলা একটা বা দেড়টার দিকে গাড়ি আখেনে পৌঁছায়। তনু মিয়া সেখানে তার পূর্বপরিচিত গাড়িচালক শাহজাহান তালুকদারকে দেখতে পান। শাহজাহান তালুকদার ছিলেন বনের বাংলাদেশ দূতাবাসের গাড়িচালক।

 

সরাফ আহমেদ বলেন, ভাবা যায় না, ওই পরিস্থিতিতেও শেখ হাসিনা ও তার পরিবার তনু মিয়াকে চা খাওয়ার টাকা দেন। ওয়াজেদ মিয়া তনু মিয়াকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানান। তিনি তনু মিয়ার হাতে কুড়িটি জার্মান মার্ক দিয়ে বলেন, ‘এটা রাখেন, আপনি চা খাবেন।’

তনু মিয়া বলেন, ‘না এটা রেখে দেন। এখন আপনাদের খারাপ সময়।’ এই সময় শেখ হাসিনা এসে জোর করে কুড়িটি মার্ক তনু মিয়ার হাতে গুঁজে দেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023