স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
নারিকেল গাছের দাম ১ কোটি টাকা। টিনশেড ঘরের ক্ষতিপূরণ বাবদ ধরা হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা। এভাবেই প্রস্তুত করা হয়েছিলো ভুয়া নথিপত্র। আয়োজন ছিলো প্রকল্পের নামে ৪৭৮ কোটি টাকা ডাকাতি। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
মাউশি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক দিল আফরোজ বিনতে আছিরের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে চলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়াও মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার এসব দুটি তদন্তে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছে। যা বাংলাদেশ জার্নালের হাতে আছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে প্রভাবশালী এ শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না-জানতে চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার পর ১০ কর্ম দিবসের মধ্যে দিল আফরোজকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে সরকারের অগ্রাধিকার পাওয়া এই প্রকল্পের পরিচালক আমিরুল ইসলামকে ওসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসাবে সরকারের বিভিন্ন স্তরের ২৩ জন কর্মকর্তার নাম এসেছে। কিন্তু এখনো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
এসব প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা শহর নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৬৭৩ কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি একনেকে পাস হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে। জায়গা নির্ধারণ করা হয়, খিলক্ষেতের জোয়ার সাহারা, সাভারের নবীনগর, হেয়মায়েতপুর, আশুলিয়া, সাতারকুল ধামরাই, পূর্বাচল, কেরাণীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও চিটাগং রোড এলাকা। প্রতিটি স্কুলের জন্য ২ একর জমি অধিগ্রহণ চূড়ান্ত করা হয়।
২০১৭ সালেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম। এরপর প্রকল্পের অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্কুলের জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ শুরু করেন। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয়, আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প ) ৬৭ দশমিক ০১% ব্যয় বৃদ্ধি দেখিয়ে ১ হাজার ১২৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রস্তাব করায়। যা খুবই অস্বাভাবিক মনে হয় প্রকল্প বোদ্ধাদের কাছে। ২০২০ সালের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সে সময়কার অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশীদকে সভাপতি করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এছাড়া আলাদাভাবে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন তদন্ত প্রতিবেদন দেয় একদল গোয়েন্দা কর্মকর্তা। দুটি প্রতিবেদনেই ভয়াবহ দুর্নীতির প্রমাণ উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, সাতটি বিদ্যালয়ের জমি নাল হলেও জমির শ্রেণি গোপন করে মূল্য নির্ধারণের সময় নাল, ডোবা, পুকুর শ্রেণির জমিকে ভিটে মাটি দেখিয়ে এবং অবকাঠামো ও গাছপালার অবিশ্বাস্য মূল্য বাড়িয়ে সরকারি বিপুল অর্থ লোপাটের প্রক্রিয়া করা হচ্ছিল। জোয়ারসাহারায় প্রস্তাবিত স্কুলের জন্য জমির প্রকৃত দাম ৪৭ কোটি ৭৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য হতে পারে ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। কিন্তু পিডি আমিরুল ইসলাম (ওএসডি) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় দুই একর জমির জন্য ৩৬৫ কোটি ৭৩ লাখ ৭৩ হাজার ২০০ টাকা প্রস্তাব করেন। এছাড়া ১১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা গাছপালার স্থানে ৬০ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হবে ৩১৭ কোটি ৯৯ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা। এই জমিতে ১৫টি কড়ই গাছের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৪ কোটি টাকা করে।
বাড্ডার সাঁতারকুল মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ নাল শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমি ডোবা শ্রেণির। যার প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৯২ টাকা। এ হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ হিসাবে ২০০ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য ২৮ কোটি ৫২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হওয়ার কথা। গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ লাখ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু শুধু জমির দামই প্রস্তাব করা হয়েছে ৩৬ কোটি ২ লাখ ৮৩ হাজার ২০০ টাকা। আর ১ লাখ টাকার গাছপালা ও অবকাঠামোর দাম দেখানো হয় ৬ কোটি টাকা। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি ৭ কোটি ৫১ লাখ ৮ হাজার টাকা।
সাভার থানার হেমায়েতপুর এলাকার বিলামালিয়া মৌজার ২ একর জমি ভূমি অফিসের পর্চা অনুযায়ী কিছু অংশ পুকুর শ্রেণির। এছাড়া অধিকাংশ জমির শ্রেণি নাল। এখানে প্রতি শতাংশের মৌজা দর ৪ লাখ ১১ হাজার ১২ টাকা। সে হিসেবে জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী তিনগুণ করে দুইশ’ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণ মূল্য আসে ২৪ কোটি ৬৭ লাখ ৭ হাজার টাকা। আর গাছপালা ও অবকাঠামোর মূল্য ১ লাখ টাকাই যথেষ্ট। অথচ পিডি আমিরুলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট ২০০ শতাংশ জমির প্রস্তাবিত মূল্য নির্ধারণ করেছে ৮১ কোটি ৮২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮ টাকা। যার মধ্যে ২১টি নারকেল গাছের দাম ১ লাখ টাকা হওয়ার কথা। সেখানে অবকাঠামো দেখিয়ে ১৩ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। এই ২ একর জমিতেই সরকারের ক্ষতি হবে ৫৭ কোটি ১৬ লাখ ৭১ হাজার ৬৮ টাকা।
এভাবে প্রতিটি প্রস্তাবিত বিদ্যাললয়ের জমির দাম হেরফের, গাছপালা, ঘর বাড়ির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব করেন সে সময়কার পিডি আমিরুল ইসলাম। আর পিডির এই অনৈতিক প্রস্তাবে অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন মাউশির কর্মকর্তা দিল আফরোজ বিনতে আছির। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি চুড়ান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রি পরিষদ বিভাগে জমা দেয়। এতে দুর্নীতির আয়োজন ধরা পড়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর পিডি আমিরুল ইসলামকে ওএসডি করে মাউশিতে পাঠানো হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এতোদিন দিল আফরোজ বিনতে আছিরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়।
তবে সর্বশেষ গত ২ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা) মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠি পাঠানো হয় দিল আফরোজকে। এতে বলা হয়, আপনি সহকারী পরিচালক, (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা উক্ত প্রকল্পের সদস্য সচিব হিসাবে ভূমি অধিগ্রহণের মূল্য তালিকা যাচাই বাছাই করে সম্পূর্ণ দুরভিসন্ধিমূলকভাবে, দুর্নীতি অভিপ্রায়ে মিথ্যা তথ্য সন্নিবেশ করে আরডিপিপি প্রস্তুতে সহায়তা করেছেন। এবং উক্ত অভভিযোগসমুহ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসাবে আপনার এমন কার্যক্রম শৃঙ্খলা ও আচ্রণ পরিপন্থী যাসরকারি কর্মচারী বিধিমালা ২০১৮ এর বিধি ৩ (খ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর আওতায় আপনার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না এই চিঠি পাওয়ার পর ১০ কার্য দিবসের মধ্যে নিম্ন স্বাক্ষরকারীর (সচিব) নিকট লিখিতভাবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। দিল আফরোজ বিনতে আছির আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যক্তিগত কোনো শুনানী চান কি-না সেটিও জানতে চাওয়া হয় চিঠিতে।