স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
২ বছর আগে বগুড়ার সোনাতলা উপজেলায় নিজ দলের একজন সদস্য বন্ধুকে খুন করে খুনি পালিয়ে যশোর জেলায়। এরপর দীর্ঘদিন সেখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকার পর নিজেকে নিরাপদ মনে করে। এরপর যশোরেই একটি মেয়ের সাথে প্রেম করে বিয়ে করে সে। খুনী ভেবেই নিয়েছিল তার এই অপকর্ম কখনো প্রকাশ হবে না। এই কিলিং মিশনে থাকা আরো ৪ জনও একই ভাবনায় দিন পার করছিল। কিন্তু বগুড়া পুলিশের নিবির তদন্ত কার্যক্রমে ধরা পড়ে যায় এই গুপ্ত ঘাতকের দল। মূল খুনিসহ একে একে গ্রেফতার করা হয় কিলিং মিশনের ৫ জনকে। সিনেমাটিক এই ঘটনাটি রহস্য উন্মোচন করে ২ বছর পর অসহায় একটি পরিবারকে ন্যয় বিচার পাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়া হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটিতে খুনের শিকার হয়েছিল বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া পশ্চিমপাড়ার হযরত আলীর পুত্র বিপ্লব সরকার। সোমবার বিকেলে বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা জানান, এই মামলাটি ক্লুলেস অবস্থায় ফাইনাল রিপোর্ট হবার পথে ছিল। কিন্তু সোনাতলা থানা পুলিশের একাগ্রতায় শেষ পর্যন্ত মামলাটির আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতার হয়।
এ ঘটনায় প্রধান হত্যাকারী রাজিব হোসেন রাজুকে যশোর থেকে গ্রেপ্তারের পর তার দেয়া তথ্য নিয়ে সোমবার আরো চারজনকে বগুড়া শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্রেফতার করা হয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে তারা বিপ্লবকে হত্যা করে বলে স্বীকার করেছে। খুনের সাথে জড়িত গ্রেফতারকৃত অন্য আসামিরা হলো শহরের খান্দার এলাকার রমজান আলীর ছেলে বেলাল হোসেন ও তার ভাই হাসান আলী, একই এলাকার আব্দুস সামাদের ছেলে আব্দুর রহমান ওরফে শুটকু, সোনাতলা উপজেলার লক্ষী নারায়ণপাড়ার মৃত রামনাত মন্ডলের ছেলে সঞ্জয় কুমার মন্ডল। পুলিশ সুপার বলেন, ২০১৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার সোনাতলা উপজেলর নগরপাড়া মহিশাপাড়া গ্রামে একটি কালভাটের নিচ থেকে অজ্ঞাত যুবকের বস্তাবন্দি ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর লাশের কোনো পরিচয় না পেয়ে পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ে করে। পরে লাশের ছবি বিভিন্ন পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করার পর যুবকের বাবা বগুড়া সদরের ঠনঠনিয়া পশ্চিমপাড়ার হযরত আলী থানায় গিয়ে লাশটি শনাক্ত করেন।
পরে মর্গেও হিমাগার থেকে তাকে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। এই মামলার তদন্ত ভার প্রথমে দেয়া হয় সোনাতলা থানার এসআই শরিফুল ইসলামকে। এর মাঝে তার অন্যত্র বদলি হওয়ায় দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে এসআই আব্দুল মান্নানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু তারা কেউই মামলার কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞার নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার সোনাতলার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাহিদ হোসেন গ্রহণ করেন। পরে নিহত বিপ্লবের সাথে সম্পর্কিত সকলকে নজরদারিতে রেখে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। এর মাঝে পুলিশের ট্রেডিশনাল এবং প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় প্রধান হত্যাকারী রাজিব হোসেন (২৮) আড়াই বছর ধরে যশোরে পালিয়ে আছেন। সেখানে রাজিব তার মামার বাসায় দুই বছর ধরে অবস্থান করে। এরপর সে প্রেম করে বিয়ে করে বিগত ছয় মাস যাবৎ যশোরেই একটি ভাড়া বাসায় গোপনে অবস্থান করছে। তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (শিবগঞ্জ-সোনাতলা সার্কেল) কুদরত ই খুদা শুভ’র নেতৃত্বে সোনাতলা থানা পুলিশ যশোর থেকে রাজিবকে গ্রেপ্তার করে। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে খুনের সাথে জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। সোনাতলার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাহিদ হোসেন বলেন, আসামিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকা-ের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানিয়েছে, তারা সকলে একই গ্রুপের ছিল। নিহত বিপ্লবও বখাটে ছিল। হত্যাকা-ের কয়েক মাস আগে থেকে রাজীবের সাথে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে বিপ্লবের দ্বন্দ্ব হয়। রাজিবের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে অপর আসামি বেলাল হোসেনও বিপ্লবের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এর জের ধরে বিপ্লব বেলালকে ছুরিকাঘাত করে। এরপরই মূলত রাজীব বিপ্লবকে হত্যার পরিকল্পনা করে। রাজিবের পরিকল্পনায় অন্য আসামিরা যোগ দেয়। ঘটনার দিন বিপ্লবকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাজিব বগুড়া থেকে একটি ভাড়া করা প্রাইভেটকারে সোনাতলার কর্পুর বাজারের একটি চাতালে নিয়ে যায়।
সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল চাতালের কর্মচারী সঞ্জয়সহ অন্যান্য আসামি রাজিব, বেলাল, হাসান, শুটকুসহ আরো কয়েকজন। সেখানে বিপ্লবকে তারা উপর্যুপরী ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এরপর বিপ্লবের লাশ বস্তায় ভরে সোনাতলার নগরপাড়া মহিশাপাড়া গ্রামের কালভাটের নিচে ফেলে পালিয়ে যায়। পুলিশ জানায় এ ঘটনায় প্রধান হত্যাকারী রাজিব হোসেনকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য আদালতে প্রেরণ করা হলে সোনাতলার আমলী আদালতের বিচারক মোমিন হাসান তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া অন্য চার আসামিকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।