শিরোনাম :
১৮ মার্চ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছেন খালেদা জিয়াসহ ২০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধ: কোন দেশে কত মৃত্যু ও ক্ষয়ক্ষতি জিয়া পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বগুড়ায় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনাল ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে বসতে পারে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ৮ উপদেষ্টার দপ্তর বণ্টন, কে পেলেন কোন দায়িত্ব ইরানে শিগগির ট্রাম্পের হামলার ইঙ্গিত সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ভিন্নমত প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী

যমুনায় রেল সেতু : মাঠের কাজ শুরু হয়নি ৩ বছরেও

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

দেশের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয়ে কোনো লাগাম নেই। অনুমোদনের আগে তোড়জোড়। অনুমোদনের পর কাজের গতি তেমন দেখা যায় না উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে। সেই ছোঁয়া লেগেছে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু রেল সেতু প্রকল্পেও। অনুমোদনের সোয়া তিন বছর পার হলেও এখনো মাঠপর্যায়ের কাজই শুরু করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। মূল প্রকল্পের নকশায় জমি অধিগ্রহণ, জাদুঘর নির্মাণসহ বেশ কিছু অঙ্গ ছিল না। জমি অধিগ্রহণও হয়নি। অথচ ব্যয় বাড়ল ৭২ দশমিক ৩৯ শতাংশ বা ৭ হাজার ৪৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। পাশাপাশি বাস্তবায়নকালও বাড়ানো হলো দুই বছর। তিন বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৮.৯৫ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা (একনেক) থেকে দেয়া অনুমোদিত ব্যয় ও সময়ে বেশির ভাগ প্রকল্পই সমাপ্ত হচ্ছে না। নানা অজুহাতে প্রকল্পগুলোকে ধরে চলমান রাখা হচ্ছে। এই প্রকল্পসহ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই মাঝপথে এসে ব্যয় বেড়ে যায়। কাজ শুরু করতে সময় নেয়। এটা হলো বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাব।

 

রেল বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করবে এই সেতুটি। ফলে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) আওতাভুক্ত চারটি দেশের সাথে রেলপথে ব্যবসা বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানের সাথে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন হবে। প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাসে জাপান সফরে গিয়েছিলেন। সেই সময় প্রকল্পটির বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়। প্রকল্পের তাৎপর্য ও গুরুত্ব এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে জাইকা ঋণ দিতে সম্মত হয়। বাংলাদেশে এই প্রথম কার্ভড স্টিল ট্রাজ ব্রিজ ওয়েদারিং স্টিল রেল ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। এই প্রযুক্তিটি বাংলাদেশেও প্রথম। আর এই ব্রিজ রক্ষণাবেক্ষণে রেল কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

 

ঝুঁকি নিয়ে চলছে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার পথে রেল। এই লাইনে রেলের যাত্রীচাপও বাড়ছে। ঝুঁকির কারণে সেতুতে কচ্ছপগতিতে চলে ট্রেন। যমুনা নদীর ওপর নতুন করে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন ডেডিকেটেড রেল সেতুর কাজের জন্য ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন দেয়া হয়। ৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতু ও লাইন নির্মাণের জন্য প্রকল্প নেয়া হয়। এখন প্রকল্প মেয়াদের সোয়া তিন বছরে এসে ব্যয় ৭ হাজার ৪৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে ব্যয় পৌঁছালো ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকায়। প্রকল্পটি আগামী ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। এখন দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর করা হয়েছে। প্রকল্পটিতে দুই ভাগে ঋণ দেয়া হবে। প্রকল্পটির ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস বা ফিজিবিলিটি স্টাডি রিভিউয়ের জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং জাইকার মধ্যে গত ২৯ জুন ঋণ চুক্তি হয়েছে। জাইকা থেকে এই প্রকল্পে ঋণ পাচ্ছে সরকার।

 

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ২৬টি ট্রেন বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে পার হয়। কিন্তু ঝুঁকির কারণে সেই তুলনায় কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। তবে এই সেতু দিয়ে আগামী ২০২৩ সালে ৩০টি ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে থাকবে দুটি কনটেইনার, একটি পেট্রোলিয়াম ও দুটি খনিজ সম্পদবাহী। আর ২০৪৩ সালে যমুনা নদীর ওপর দিয়ে ৭০টি ট্রেন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮টি কনটেইনার, চারটা পেট্রোলিয়াম ও দুটি খনিজবাহী ট্রেন চলাচল করবে।

 

প্রকল্পের কাজের মধ্যে রয়েছে, নদীর ওপরে ৪.৮ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ, ৭.৬ কিলোমিটার ডাবল লাইন রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণ, ৩০.৭৩ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেল ট্র্যাক নির্মাণ, অ্যাপ্রোচ ভায়াডাকট, মাইনর ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ ১৬টি, বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব ও সেতু পশ্চিম রেলওয়ে স্টেশনে কম্পিউটার বেসড ইন্টারলকিং সিস্টেম স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দফতর ও আবাসিক সুবিধা, জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে ব্রিজ এলাকায় নতুন একটি জাদুঘর নির্মাণ, ১৮৭ একর জমি অধিগ্রহণ ইত্যাদি।

 

ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, নকশা ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে ব্যয় ১ শ’ কোটি টাকা কমলেও নতুন কিছু অঙ্গ ও মূল কাজে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখানে ৪.৮ কিলোমিটার রেলওয়ে ব্রিজ নির্মাণ, ৭.৬ কিলোমিটার ডাবল লাইন রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ, ৩০.৭৩ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেল ট্র্যাক নির্মাণ, স্টেশন ভবন নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দফতর ও আবাসিক সুবিধা নির্মাণে প্রথম ব্যয় ধরা হয় ৭ হাজার ৯১১ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন তিন বছর পর এসে এই খাতেই ব্যয় বেড়েছে ৫ হাজার ২১৩ কোটি ১৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। ফলে এই খাতে ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৩ হাজার ১২৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। মূল প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের খাত ছিল না। এখন এই খাতে ১৮৭ একর জমির জন্য ৩৩৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় নতুন করে ধরা হয়েছে। জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নিদর্শন হিসেবে ব্রিজ এলাকায় নতুন একটি জাদুঘর নির্মাণের জন্য ৬৯ কোটি ৭১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর সিডি ভ্যাট খাতে ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। ৩০ শতাংশ ধরে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ৭১৯ কোটি ৫৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা। এখন ৩৫ শতাংশ ধরে এই ব্যয় বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ১১৭ কোটি ৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সংশোধিত প্রকল্পে ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক খাতে সরকারি তহবিল থেকে ২১২ কোটি টাকাসহ ৮১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা বাড়ছে। আবার সরকারি অর্থে ম্যানেজমেন্ট সাপোর্ট পরামর্শক বাবদ ৫২ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত ডিজাইন ও সুপারভিশনে খরচ হয়েছে ২০৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তবে ভূমি অধিগ্রহণে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।

 

অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের মতে, বঙ্গবন্ধু রেল সেতু প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি এটা নতুন কিছু না। পদ্মা বহুমুখী সেতুতে যে ব্যয় প্রাক্কলন করে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়, পরে চার গুণ ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু মেগা নয়, ছোট ছোট প্রকল্পগুলোতেও এই ঘটনা ঘটছে। প্রকল্প তৈরির সময় সঠিকভাবে প্রাক্কলন করা হয় না। পাস করানোর জন্য কম ব্যয় দেখিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করিয়ে নেয়া হয়। তারপরই আসে ব্যয় বৃদ্ধি ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব। এই সংস্কৃতি থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। জবাবদিহিতা নেই বলেই এসব হচ্ছে। এখানে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প বেশি নিয়ে বরাদ্দ পর্যাপ্ত দেয়া হয় না।

 

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও বর্তমান পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় খাতে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে তা প্রকৃতভাবে যাচাই করা উচিত। জাপানের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব আছে। কিন্তু এটার জন্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা খরচ করে জাদুঘর করার প্রয়োজনীয়তা আমি দেখছি না। এসব সঠিকভাবে তদারকি হওয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে সময় অপচয় করলে তো ব্যয় বাড়বেই। তিন বছর পর ব্যয় কেন বাড়ছে তার ব্যাখ্যা চাওয়া দরকার। কারণ এটা জনগণের টাকা।

 

ড. জাহিদ বলেন, এই প্রকল্পসহ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগই মাঝপথে এসে ব্যয় বেড়ে যায়। কাজ শুরু করতে সময় নেয়। এটা হলো বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাব। মন্ত্রণালয়গুলোর জবাবদিহিতা নেই। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনও দায় এড়াতে পারবে না। কারণ, মাঝ পথে এসে নকশা পরিবর্তন এটা দেখার দায়িত্ব কমিশনের। প্রকল্প অনুমোদনের পর তার বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা নজরদারির দায়ও পরিকল্পনা কমিশনের। আইএমইডির দায় রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনেরও একটা ঘাটতি এক্ষেত্রে দেখা যায়। প্রকল্প পরিচালক মো: কামরুল আহসানের সাথে গত রাতে এ নিয়ে সেল ফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

 

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ও সিনিয়র সচিব শামীমা নার্গিস জানান, নতুন করে নকশা পরিবর্তন ও নতুন কিছু অঙ্গ সংযোজন করার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। এ ছাড়া সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন ওয়ার্কস এবং প্যাকেজ-৩ এর কাজের ব্যয় বাড়ার বিষয়ে জাইকাকে জানানো হয়েছে। তাই বাড়তি ঋণ দেবে জাইকা।

 

ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, জাইকা নতুন করে প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখেছে, ব্যয় বাড়বে। এ কারণেই প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের চার হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে জাপান সরকারের উন্নয়ন সংস্থা-জাইকা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023