ডিসেম্বর শেষ হতে চললেও এবার এখন পর্যন্ত শীত কম। সেভাবে জেঁকে বসেনি কুয়াশা। উত্তরাঞ্চলেও এবার শীত-কুয়াশার দাপট নেই। ঘূর্ণিঝড় মিধিলির প্রভাবে শুরু বোরোর বীজতলার কিছুটা ক্ষতি হলেও দ্রুত আবহাওয়া পরিবর্তনে খুব একটা সমস্যা হয়নি। এতে ভালো অগ্রগতি হয়েছে বোরো ধানের বীজতলা তৈরির। কেটে গেছে চাষিদের শঙ্কা।
সবমিলে বোরোর বীজতলা তৈরি নিয়ে বড় সুখবর রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও এবছর বোরো ধানের বেশি বীজতলা করতে যাচ্ছেন চাষিরা। অর্থাৎ, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি মৌসুমে বোরোর উৎপাদন বাড়বে।
বীজতলা তৈরিতে ভালো অগ্রগতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বোরোর বীজতলা তৈরিতে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। যেখানে গত বছর একই সময়ে অগ্রগতি ছিল ৫২ শতাংশ। এরপরেও জানুয়ারির মাঝামাঝি বীজতলা তৈরি চলবে সারাদেশে। ফলে এবছর বীজতলা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবছর বোরোর বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৪২ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে। এখন পর্যন্ত বীজতলা হয়েছে ২ লাখ ২১ হাজার ৩৫৫ হেক্টরে। গত বছর এসময় ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার হেক্টরের কিছু বেশি।
তথ্য আরও বলছে, গত বছর দেশে শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর বীজতলা করা হয়েছিল। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৪১ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ, বীজতলায় অগ্রগতি ছিল প্রায় ১১২ শতাংশ। এবছর জমির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সারাদেশের তথ্য বলছে, এখনো কোথাও কোথাও বীজতলা রোপণ শুরু হয়েছে, কোথাও হালি চারা তৈরির অপেক্ষা করছেন কৃষক।
সেচের দাম এখনো নির্ধারণ হয়নি এবছর। সেচ খরচ যৌক্তিক রাখতে এবার মাঠপর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া এবছর সারের পর্যান্ত বরাদ্দ রয়েছে। ফলে সার সংকটে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই।- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ,
বোরোর উৎপাদন বাড়ার আশা
চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের আসন্ন মৌসুমে ৫০ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ২ কোটি ১৭ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যেখানে গত মৌসুমে (২০২২-২৩ অর্থবছর) উৎপাদন হয় ২ কোটি ৭ লাখ টন। তবে গত অর্থবছরের উৎপাদন তার আগের বছরের চেয়ে প্রায় দুই লাখ টন কম ছিল। আগের অর্থবছর উৎপাদন হয় ২ কোটি ৯ লাখ টন। এবছর বীজতলা বাড়লে উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আশা করা হচ্ছে চলতি বছর ২ কোটি ২০ লাখ টনের কাছাকাছি হবে বোরোর উৎপাদন, যা অন্য বছরের চেয়ে বেশি। এবার এখন পর্যন্ত আবহাওয়া পুরোপুরি অনুকূলে রয়েছে। এবার শীত কম, শেষ পর্যন্ত কম হবে, সেটা ধানের ফলনের জন্য ভালো। চাষিরাও কুয়াশা না থাকায় বেশি বেশি বীজতলা করছেন। ধানের দাম, উন্নত প্রযুক্তি ও বীজ এবং সরকারের বড় প্রণোদনার কারণে কৃষক বোরোর প্রতি আগ্রহী হয়েছে।’
বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের চাষিরাও দরদ দিয়ে বোরো আবাদ করে। দাম না পাওয়া, সার-বীজ সংকটে তাদের মধ্যে আগে যে অনীহা তৈরি হতো, সেটা একদমই নেই। সেচের জন্য আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করছি। সেচের বিদ্যুতের কোনো সমস্যা হবে না। সারের মজুতও পর্যাপ্ত রয়েছে। সবকিছু এখন পর্যন্ত অনুকূলে এবছর। আশা করছি, খুব ভালো ফল পাবো।
সরকারও এবছর বোরোর উৎপাদন বাড়াতে বেশ আন্তরিক। চলতি অর্থবছরে বোরো মৌসুমে উচ্চফলনশীল জাতের ধানের আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে দুই দফায় ১০৭ কোটি ৬২ লাখ এবং ৯০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। সব মিলিয়ে দুই ধাপে বোরোতে প্রণোদনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯৮ কোটি টাকা। আর উপকারভোগী কৃষকের সংখ্যা দাঁড়ালো প্রায় সাড়ে ২৯ লাখ।
এর আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক একজন কৃষক এক বিঘা জমিতে চাষের জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ কেজি উফশী জাতের বীজ, ১০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে পাচ্ছেন।
বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশির ভাগ এলাকায় বীজতলা প্রস্তুতের পাশাপাশি এখন ইরি-বোরো ধান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষক। কোথাও জমি প্রস্তুতের কাজ চলছে, কিছু এলাকায় বীজতলা রোপণ, ক্ষেতে পানি দেওয়ার কাজে ব্যস্ত কৃষক।
ব্যয় বাড়ার দুশ্চিন্তা অনেক চাষির
সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি, সারসহ নানা খাতে এবার বোরো উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় বাড়বে। সামনের দিনগুলোয় তা আরও বাড়তে পারে। এতে চিন্তিত কৃষক। তারা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে বোরো ধান চাষে দু-তিন বছরের ব্যবধানে প্রতি বিঘা জমিতে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু গত মৌসুম শেষে ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে উৎপাদন খরচ উঠছে না।
নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার কোলা গ্রামের কৃষক ফজলুল হক বলেন, ‘এবছর প্রায় সাত বিঘা জমিতে বোরো চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছি। গত মৌসুম থেকে এবছর বোরো ধান চাষাবাদে খরচ অনেক বেশি পড়বে। কারণ, গত বছর প্রতি ঘণ্টায় (পুরো মৌসুমে) সেচের পানি নিতে খরচ প্রায় দুই হাজার টাকা বেড়েছে। এছাড়া সার, কীটনাশক ও বীজের দামও বাড়তি।
কয়েকজন কৃষক জানান, প্রতি কেজি বীজধান গত বছর ২০০-২৫০ টাকা ছিল, সেটা এখন ৩৫০ টাকা। এছাড়া সরকার সারের দাম বাড়ানোর পরে এ খাতে খরচ ২ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৫শ টাকা। একই সঙ্গে কীটনাশক, ধান রোপণের মজুরি, শ্রমিকের পারিশ্রমিক, ধান মাড়াইসহ পরিবহনে গুনতে হবে বাড়তি খরচ।
কৃষকদের খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে। শুধু হাইব্রিড নয়, অন্য জাতের ধান চাষের জন্যও প্রণোদনা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের ফসলের ভালো দাম দিলেই যথেষ্ট উৎপাদন সম্ভব। দাম না পেলে তারা আগ্রহ হারাবে।– বিআইডিএস-এর সাবেক পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান,
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সেচের দাম এখনো নির্ধারণ হয়নি এবছর। সেচ খরচ যৌক্তিক রাখতে এবার মাঠপর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া এবছর সারের পর্যান্ত বরাদ্দ রয়েছে। ফলে সার সংকটে দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই।’
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) হিসাবে, চলতি মৌসুমে বোরোতে এক কেজি চাল উৎপাদনের খরচ ৩ টাকা বেড়ে হবে প্রায় ৪১ টাকা। ধানের খরচ কেজিপ্রতি ২৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সার কেনায় বেড়েছে খরচ।
এদিকে চলতি মৌসুমে বোরোতে এক কেজি চাল উৎপাদনের খরচ ৩ টাকা বেড়ে হবে প্রায় ৪১ টাকা। ধানের খরচ কেজিপ্রতি ২৮ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৩১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছর থেকে বেশি দামে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও সার কেনায় বেড়েছে খরচ।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান বলেন, ‘কৃষকদের খরচ অস্বাভাবিক বেড়েছে। শুধু হাইব্রিড নয়, অন্য জাতের ধান চাষের জন্যও প্রণোদনা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকের ফসলের ভালো দাম দিলেই যথেষ্ট উৎপাদন সম্ভব। দাম না পেলে তারা আগ্রহ হারাবে।’
বেড়েছে চাল উৎপাদন
বাংলাদেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছিল। গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) উৎপাদন হয় ৩ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টন। দশ বছর আগের তুলনায় এখন অন্তত ৫০ লাখ টন চাল বেশি উৎপাদন হচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার টন।
বাংলাদেশে তিন মৌসুমে চাল উৎপাদন হয়। সবচেয়ে বড় মৌসুম বোরো। এ মৌসুমে ধান আবাদ করা হয় ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে। চাল ওঠে এপ্রিল ও মে মাসে। বোরোর পরই আউশের আবাদ হয়। আমনের আবাদ হয় ভরা বর্ষায়। আউশ ও আমন বৃষ্টিনির্ভর হলেও বোরো সেচনির্ভর।
গত অর্থবছর দুই কোটি ৭ লাখ টন বোরো, এক কোটি ৫৪ লাখ টন আমন ও ২৯ লাখ টন আউশ ধান উৎপাদন হয়েছে। গত এক দশকে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বোরোর উৎপাদন। তবে এসময় আউশের উৎপাদন কমেছে।