স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
এই মুহূর্তে রাশিয়ার মতো ভালো ভোট অনুষ্ঠান বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। সম্প্রতি রাশিয়ার জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাশিয়ার ভোট নিয়ে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সিইসি এসব কথা জানান।
সিইসি কে এম নূরুল হুদা গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানকার ভোট পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। ২১ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাশিয়ার ভোট নিয়ে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সময়ে রাশিয়ায় ব্যালটে ভোট হলেও ভোটিং ব্যবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে উন্নত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিইসি বলেন, ‘এই মুহূর্তে রাশিয়ার মতো ভোট অনুষ্ঠান বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, রাশিয়ার নির্বাচন ব্যবস্থা ভালো। আমাদের থেকে তাদের পার্থক্য হলো—সেখানে আমাদের মতো রাস্তাঘাটে ব্যানার, ফেস্টুন বা দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার নেই। নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে আমাদের এখানে প্রার্থী বা তার সমর্থকরা প্রচারণা চালান, রাশিয়ায় সেই সুযোগ নেই। সেটা করা হয় না। সে দেশে নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা মূলত অনলাইনভিত্তিক বেশি হয়। ডিজিটাল সিস্টেম অত্যন্ত উঁচুমানের।’
নূরুল হুদা বলেন, ‘আমাদের দেশে কর্মীরা যেমন ঘরে ঘরে ভোটারদের কাছে যান অথবা লিফলেট দেন, এই জাতীয় কালচার সেখানে দেখিনি।’
রাশিয়ার ভোটার ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজড
সিইসি বলেন, ‘রাশিয়া ভোটার ব্যবস্থাপনাটি ডিজিটালাইজড করে ফেলেছে। তাদের প্রায় ৯৮ হাজার লোকেশন। এসব কেন্দ্র তারা সিসিটিভির আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা কেন্দ্রীয়ভাবে সব দেখতে পারে। বড় হলঘরের চারপাশের দেয়ালে টানানো আছে সিসিটিভির স্ক্রিন। কোন কোন এলাকায় কখন কী ঘটে, সব তারা দেখতে পারেন। প্রত্যেকটির সঙ্গে তাদের লিংক আছে। কত ভোট কাউন্ট হয় সেটাও তারা দেখতে পারেন। প্রত্যেক মিনিটে মিনিটে তারা এটা মনিটর করতে পারে। সেই ব্যবস্থা আছে। সাংবাদিকরাও সেটা মনিটর করেন। টাইম টু টাইম নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন।’
১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভোট হয়েছে উল্লেখ করে কে এম হুদা বলেন, ‘তিন দিন তাদের ভোট হয়েছে। এই তিন দিনের মধ্যে কে কোন দিন তারা ভোট দিতে পারবেন, এটা ডিস্ট্রিবিউশন করে দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে তাদের ভোটার বাক্স তিন দিন সংরক্ষিত থাকে। সেন্টারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো। কোনও অভিযোগ ছিল না যে ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স অসুবিধা করেছে।’
তিনি জানান, রাশিয়ায় ইভিএম পদ্ধতি নেই। তারা পাসপোর্ট দেখে ভোটার শনাক্ত করে। পরে একটা ব্যালট পেপার দেয়, ভোটর সেটা বাক্সে রাখেন। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সেটা ভেতরে ঢুকে যায়। কতজন ভোট দিলো সেটা সঙ্গে সঙ্গে মনিটরে দেখা যায়। ভোট গণনা হয় হাতে হাতে, বাই হ্যান্ড। ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, যারা ভোটকেন্দ্রের বাইরে থাকেন, তাদের অনলাইনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। অ্যাপ ব্যবহার করে তারা যেকোনও জায়গায় বসে ভোট দিতে পারেন।
সিইসি জানান, নির্বাচন দেখতে ৪৯টি দেশের প্রায় আড়াই’শ পর্যবেক্ষক ছিল। ভোট হওয়ার পর ২০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে গণমাধ্যমের মিটিং হয়। সেখানে পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল। আমিও মতামত প্রকাশ করি। বলেছি, তাদের দেশের ডিজিটাল সিস্টেমটা আমার ভালো লেগেছে। এটা স্বচ্ছতার সঙ্গে অনুধাবন করা যায়। কোনও রকমের বিষয় আমাদের চোখে আসেনি।
রাশিয়ার মতো ভোট দেশে আপাতত সম্ভব নয়
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘রাশিয়ার মতো ভোট বাংলাদেশে আপাতত সম্ভব নয়।’ ওই রকম ভোট করতে বাংলাদেশের কত বছর লাগবে, সেটাও তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ভোটের প্রযুক্তি নির্ভরতা বেড়ে গেলে ধীরে ধীরে প্রচারণার পদ্ধতিটা কমে যাবে। যতই আমরা প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে যাবো, তত সুবিধা হবে।’
আমাদের নির্বাচনে আস্থার সংকট প্রশ্নে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আস্থার সংকটের বিষয়টি রাজনৈতিক ব্যাপার। এটা বলতে পারবো না। আর তাদের ব্যালট পেপার তিন দিন রাখার মতো, যে নিরাপত্তা অবকাঠামো আছে তা আমাদের এখানে নেই। গ্রামাঞ্চলে ছোটখাটো টিনের চালা এমনকি ক্যাম্পের মধ্যে আমাদের নির্বাচন কেন্দ্র থাকে। ওইসব কেন্দ্রে তিন দিন ব্যালট পেপার রাখার মতো নিরাপত্তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। অথবা সক্ষমতা নেই। তাদের শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থার জন্য মানুষ একটি অবস্থানে পৌঁছে গেছে। আমাদের সেখানে যেতে একটু দেরি হবে।’
তিনি জানান, রাশিয়ায় ইভিএম নেই। তবে অন্যরকম ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা তাদের আছে। তারা হয়তো ইভিএম শুরু করবে। ম্যানুয়েল ভোটে আমাদের সমস্যা হয়, এটা আপনারা জানেন। আমরা জানি। সে কারণেই আমাদের কাছে ইভিএমের প্রচুর ডিমান্ড থাকে। নির্বাচন এলেই বিভিন্ন পর্যয় থেকে, যেমন- মন্ত্রী, এমপি ও প্রার্থীরা তার এলাকায় ইভিএম দেওয়ার অনুরোধ করেন। ইভিএমের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া থেকে কী শিখেছি
রাশিয়ার নির্বাচন থেকে আমরা কী শিখেছি এমন প্রশ্নের জবাবে কে এম হুদা বলেন, ‘তাদের যে শৃঙ্খলাবোধ, যেমন- ভোটে তারা পোস্টারিং করে না, মাইকিং করে না। নির্বাচনের চারপাশে কোনও জটলা নেই। ডিজিটাল পদ্ধতিতে তারা যে প্রচারণা চালায়, সেই অবস্থায় আমরা যত তাড়াতাড়ি যেতে পারি, ততই আমাদের ভালো হবে। এটাই আমার শিক্ষা।’
রাজনৈতিক দলের লোকেরা বলেন নির্বাচনে আস্থা নেই, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন মোটেই অনাস্থার জায়গা নয়। জনগণের আস্থা কমিশনের ওপর নেই—এ কথা কোনোভাবেই বলা যাবে না। কারণ, জনগণ আপনাকে বলেনি যে আস্থা নেই। রাজনৈতিক দলের লোকেরা এটা বলেন। অনেক সময় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তারা করেন না। অথচ তারা বলেন যে নির্বাচনে জনগণের আস্থা নেই। জনগণের আস্থা যদি না-ই থাকতো, তাহলে আপনারাই যে দেখাচ্ছেন ভোটে উপচে পড়া ভিড়। লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেয়। ৬০-৮০ শতাংশ ভোট পড়ে। এটা কি আস্থার জায়গা নয়? জনগণের আস্থা অবশ্যই আছে। তারা অবশ্যই ভোট দিতে যায়।’
ভোটের সহিংসতা প্রসঙ্গে সিইসি
সিইসি বলেন, ‘প্রত্যেকটি মৃত্যু আমাদের জন্য দুঃখজনক। এটা কারও কাম্য নয়। আমি শুনেছি, ভোটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে একজন মারা গেছেন। তবে এটা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করলে জানা যাবে এর জন্য কে দোষী বা কে দোষী নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতিতে হতাহত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে। আমরা কোনও মৃত্যু চাই না। আমাদের অবশ্যই নির্দেশনা থাকবে—সব পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেয়।’