স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
চাহিদার তুলনায় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে হচ্ছে নতুন নতুন রেকর্ড। তারপরও গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র দেখা দিচ্ছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। এমনকি রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতেও হচ্ছে লোডশেডিং। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে যেমন গরমে জনজীবনে দুর্ভোগ, তেমনি মানুষের কাজের ব্যাঘাতও ঘটাচ্ছে।
যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, লোডশেডিং হচ্ছে না। বিদ্যুতের ঘাটতি নেই। চাহিদা অনুযায়ীই উৎপাদন হচ্ছে। তবে সঞ্চালন বা ত্রুটি সংক্রান্ত অন্য কোনো কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। আর দেশে গড় চাহিদা দৈনিক ১৩ হাজার মেগাওয়াট। এই চাহিদা অনুযায়ীই বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
পিডিবির তথ্যমতে, সম্প্রতি (১২ এপ্রিল) দেশে ১৩ হাজার ৩৭৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২৬ এপ্রিল ১৩ হাজার ৫২০ মেগাওয়াট, ১৫ এপ্রিল ১৩ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট, ১০ এপ্রিল ১৩ হাজার ৬৪ মেগাওয়াট, ৩ এপ্রিল ১৩ হাজার ১৮ মেগাওয়াট এবং ১ এপ্রিলে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের মোট গ্রাহক প্রায় চার কোটি। দেশে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ৯৯ শতাংশ। গ্রাহকদের চাহিদা মিটাতে ১২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। এসব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৫ হাজার মেগাওয়াটে। বর্তমানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টা হয়েছে।
এছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প চালু হলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখনও অনেক এলাকায় কমবেশি লোডশেডিং হচ্ছে। ধানমন্ডি, গুলশানসহ অভিজাত এলাকাগুলোতেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। এতে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের আইটি বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কে এম নাফিজ মুন বলেন, এ এলাকায় নিয়মিতই লোডশেডিং হচ্ছে। গতকাল রাতেও একবার হয়েছে। এর আগেও একদিনে একাধিকবার লোডশেডিং হয়েছে।
তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ে যে শুধু গরমে অতিষ্ঠ হচ্ছি ঠিক তা নয়। আমাদের কাজেরও চরম ব্যাঘাত ঘটছে। অল্প সময়ের জন্য বিদ্যুৎ গেলেও এটি দেখা যায় দীর্ঘসময়ের প্রভাব ফেলছে। কর্মীদের সম্পূর্ণ করা কাজ অনেক সময় হারিয়েও যাচ্ছে। বিশেষ করে কম্পিউটারে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। নানা রকম জটিলতা তৈরি করছে লোডশেডিংয়ে। আসলে ভোগান্তির শেষ নেই।
নয়াপল্টন এলাকার একটি ছাপাখানার ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন বলেন, পল্টন এলাকায় প্রায় বিদ্যুৎ চলে যায়। বিদ্যুৎ গেলে মেশিন বন্ধ রাখতে হয়। কর্মচারীরাও কাজ করতে পারেন না।
এছাড়া রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় কমবেশি বিদ্যুৎবিভ্রাট হওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন শহরবাসী।
খিলগাঁও শান্তিবাগ এলাকার বাসিন্ধা আবু নাইম বলেন, প্রতিদিন দুই-তিন বার করে বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুৎ গেলে ১৫ থেকে ২০ মিনিট, কখনো ঘণ্টাও পার হয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ি রায়েরবাগ এলাকার বাসিন্ধা শেখ ফরিদ বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রতিদিনই বিদ্যুৎ যাচ্ছে। এর উপরে যদি আবার ঝড়-বৃষ্টি হয় তাহলেতো দীর্ঘসময়ের জন্য বিদ্যুৎ থাকে না।
এদিকে, শহরের বাইরে লোডশেডিং সমস্যা প্রকট। দিনে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎহীন থাকতে হয় গ্রামাঞ্চলের মানুষের। প্রত্যান্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট আরও ভয়াবহ।
নরসিংদী জেলার মনোহরদীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন চার-পাঁচ বার করে লোডশেডিং হচ্ছে। নোয়ানগর গ্রামের সজিব মিয়া বলেন, প্রতিদিন বেশ কয়েকবার করে বিদ্যুৎ যায়। বিশেষ করে আকাশে মেঘ দেখা গেলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। একবার গেলে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ আসে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, লোডশেডিং হওয়ার প্রধান কারণ বিতরণ ব্যবস্থাপনা। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী লাইন দেয়া হলেও পরবর্তিতে একই লাইনে কয়েকগুণ বেশি করে গ্রাহকে সেবা দেয়া হয়। এ কারণে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করা হচ্ছে।
যদিও সংশ্লিষ্টদের বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন খাতে সময়োপযোগী উন্নয়ন না হওয়ায় এই সমস্য হচ্ছে। বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে গেলেও বিতরণ ও সঞ্চালন সমস্যায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা যাচ্ছে না। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন খাতে বেশকিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। এগুলো দ্রুত গতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে।