বন্যায় ক্ষতবিক্ষত রংপুর অঞ্চলের দুই লাখ কৃষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২০

রংপুর প্রতিনিধি

এবারের কয়েক দফা বন্যায় তিস্তার ১৫২ কিলোমিটার এবং ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার এলাকার ৩৬০ কিলোমিটার অববাহিকার ক্ষতবিক্ষত দুই লাখ কৃষক। ক্ষতি হয়েছে দেড় শ’ কোটি টাকার বিভিন্ন ফসল। ফলে বিবর্ণ এখন কৃষকদের জীবন। কিভাবে চলবে বাকি দিনগুলো, সেই চিন্তায় দিশেহারা তারা। কিন্তু মাঠে তাদের পাশে নেই কৃষি বিভাগ। এমনকি কৃষি প্রণোদনার কথাও জানেন না তারা। ফলে এবার ৬ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে ১৪ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলেও আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা হবে না। তবে আবার পানি বাড়লে ২৮ হাজার কৃষককে আমনের বদলে মাষকলাই সাপোর্ট দেয়ার প্রস্তুতি আছে কৃষি বিভাগের।

 

রংপুর আঞ্চলিক খামারবাড়ি সূত্র জানিয়েছে, খামারবাড়ির নথিতে কয়েক দফা বন্যায় রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯ জন। টাকার অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে ১৭২ কোটি ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৩৮৪ টাকার ফসল। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ২৫ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে ১৪ হাজার ৪৪৬ হেক্টর জমির আবাদ। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৫০৫ হেক্টরের ফসল। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাট। এ অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৪২ দশমিক ৭৭ হেক্টর জমির ৫২ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৮০০ টাকার পাট নষ্ট হয়ে গেছে। এতে পথে বসেছেন ৬৫ হাজার ১০৯ জন পাটচাষি। ৩৬ হাজার ১৮৩ জন কৃষকের ৪ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৬৩ হেক্টর জমির আউশ আবাদ নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪৮ কোটি ২৬ লাখ ৫ হাজার ৬৪০ টাকার। ১৬ হাজার ৯২৩ জন কৃষকের ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২ হেক্টর জমির ৪১ কোটি ৮১ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ টাকার শাকসবজি নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়াও আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ১ হাজার ৪৫৪ টাকার। এতে ১ হাজার ২৬৫ দশমিক ৭৮ হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ২৩০ জন কৃষক। ১ হাজার ২২২ জন কৃষকের ১১০ দশমিক ৭৪ হেক্টর জমির ১ কোটি ১৬ লাখ ২৩ হাজার ৮৪০ টাকার রোপা আমন, ৬২২ জন কৃষকের ২৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ৩৫ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫০ টাকার ভুট্টা, ২ হাজার ৩৬৮ জন কৃষকের ২০৫ হেক্টর জমির ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার মরিচ, ৩ হাজার ৯০ জন কৃষকের ৩৭৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ৩ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকার তিল, ৩০৫ জন কৃষকের ৩০ দশমিক ৬ হেক্টর জমির ২৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ টাকার চীনাবাদাম এবং ১ হাজার ২২৫ জন কৃষকের ২০ হেক্টর জমির ১৮ লাখ টাকার কাউনের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা কৃষক। বিস্তীর্ণ মাঠে এখন বন্যার দগদগে ক্ষত। নষ্ট হওয়া আমন লাগানো নিয়ে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই আমনেই পেটে ঢুকবে অন্ন। হাতেও নেই টাকা। চড়া সুদে টাকা লগ্নি নিলেও মিলছে না বীজ। পেলেও দাম লাগামহীন। হতাশ কৃষকের সামনে এখন ঘনঘোর অন্ধকার। কিভাবে চলবে জীবন, চোখেমুখে অনিশ্চিত জীবন-জীবিকার ছাপ তাদের।

 

 

রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারীর মহিপুরের সামর্থ্যবান চাষি আনারুল ইসলাম জানালেন, বাবা মারা যাওয়ার পর মা, ভাইবোন, ভাগনীসহ সাতজনের সংসারের বোঝা এখন তার ঘাড়ে। এবার চার বিঘা জমিতে লাগিয়েছিলাম। কিন্তু বন্যায় সব শেষ। ১ হাজার টাকা সুদের ওপর নিয়ে কিছু চারা কিনে খোসা দেয়ার চেষ্টা করছি। আরো আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা লাগবে চারা কিনতে। সুদের ওপর টাকা খুঁজছি। কিন্তু এখনো পাইনি। টাকা পেলেও বাজারে চারা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি ধান লাগাতে না পারি তা হলে খাবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হবে। দেখি আল্লাহ কী করেন।

 

একই এলাকার কৃষক সাব্বির আলী জানালেন, মহাজনরাও সুদ দিতে চাইছেন না। কারণ শোধ করতে পারব না। আবাদ শেষ। জমি এবার শুকনায় পড়ে থাকবে।

কাউনিয়ার মর্নেয়ার চরের কৃষক আবদুল আজিজ জানালেন, আমন এবার লাগাতে পারব না। সব শেষ। চারার দাম এত বেশি। কোথায় পাব টাকা।

এ দিকে কৃষি বিভাগ প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষতি পোষানোর কথা জোর দিয়ে বললেও বিষয়টি জানেনই না ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। এমনকি এত দুর্যোগে কৃষকের কাছেও যায়নি মাঠ বিভাগের কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

 

পীরগাছার তাম্বুলপুরের চরের কৃষক আমজাদ আলী জানালেন, আমরা জানি না সরকার চারা কিংবা টাকা দিতেছে। বন্যায় সব আবাদ শেষ হয়ে গেল। কৃষি বিভাগের লোকজন কোনো দিন আমাদের কাছে আসেনি। খোঁজও নেয়নি।

 

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বেলকার চরের কৃষক লাবলু মিয়া জানালেন, বন্যায় ফসল সব নষ্ট হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো লোক আমাদের খোঁজ নেয়নি। বীজ বা অন্যান্য জিনিস দেয়া তো দূরের কথা।

 

তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বসান এবং আবার বন্যা না হলে এ অঞ্চলে ৬ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা খামারবাড়ির। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জানান, এবারের বন্যায় দুই দফায় ১ লাখ ৭২ হাজার কৃষক এবং ১৭৩ কোটি টাকার মতো কৃষকদের ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনের। প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষকদের ক্ষতি পোষানোর। আমরা নাভি জাতের আমনের চারা করেছি ১২১ হেক্টর জমিতে। ৫০০টি ভাসমান চারা করেছি। সাড়ে ১০ হাজার কৃষককে শাকসবজির প্যাকেজ দিয়েছি। নতুন করে আর বন্যা না হলে আমনের টার্গেট ৬ লাখ ৫ হাজার হেক্টও জমিতে পূরণ হবে। তবে যদি নতুন করে আবার পানি বাড়ে তা হলে ২৮ হাজার ২০০ কৃষকের জন্য আমরা মাষকলাইয়ের প্রণোদনা দেয়ার জন্য তৈরি আছি।

 

তবে তিনি বলেন, ২ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবাইকে প্রণোদনার আওতায় আনার সুযোগ নেই। প্রণোদনার বাইরে যারা আছেন, তাদের আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দিচ্ছি। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।

বন্যার কারণে তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ঘাঘটের ৫১৪ কিলোমিটার অববাহিকার বিস্তীর্ণ ফসলি মাঠে এখন দগদগে ক্ষতচিহ্ন। বিবর্ণ সব কিছুই।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023