ডেস্ক রিপোর্ট
ফেনীর পরশুরামে সাপে দংশনের পর ফের সাপ দিয়ে অপচিকিৎসা ও পৈশাচিক কায়দায় প্রবাসীর স্ত্রীকে নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি গৃহবধূর ননদ ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা থেকে ননদ হাসিনা আক্তার ও তার স্বামী আবুল কাশেমকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছেন ফুলগাজী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এএনএম নুরুজ্জামান।
এর আগে গৃহবধূ খালেদা ইসলাম অমিকে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়।
নির্যাতিতা গৃহবধূ খালেদা ইসলাম অমি পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়া গ্রামের চৌধুরী বাড়ির আবুল হাসেমের ছেলে স্পেন প্রবাসী লিখন খানের স্ত্রী।
গৃহবধূ খালেদা ইসলাম অমির স্বজনরা জানায়, ২০১৬ সালে পারিবারিকভাবে অমি ও লিখনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের জন্য শাশুড়ি খাইরুন নেছা, দেবর মো. রাসেল, বোন নুর নাহার, হাছিনা ও সামছুন নাহার, বোনের স্বামী আবুল কাশেম, ভাগিনা মোহাম্মদ হোসেন মিলে গৃহবধূ খালেদাকে নানাভাবে নির্যাতন করতো।
খালেদার মা শাহেন আরা বেগম জানান, ‘গত ৭ই আগস্ট রাতে খালেদাকে একটি বিষধর সাপ দংশন করে। খালেদা মৃত্যুর যন্ত্রণায় ছটফট করলেও তাকে সেসময় কোন চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরদিন ৮ আগস্ট বিকেলে পাশের এলাকার একজন সাপুড়ে এনে (ওঝা) পুনরায় সাপ দিয়ে অপচিকিৎসার নামে খালেদাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে। সাপকে খালেদার শরীরে ছেড়ে দিয়ে পানি ঢেলে নির্যাতনের ভিডিও ও ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন ৯ আগস্ট খালেদাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ফেনী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি।
পরে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকের পরামর্শে গুরুতর অসুস্থ্য খালেদাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে ৮দিন চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হলে গত ১৭ই আগস্ট খালেদাকে আমাদের ফুলগাজীর বাড়িতে নিয়ে আসি।’
শাহেন আরা বেগম আরও বলেন, ‘খালেদাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর খবর পেয়ে স্বামী লিখনের মা (খালেদার শাশুড়ি) সহ আরও লোকজন আমাদের বাড়িতে এসে আমার মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমাদের পরিবারের লোকজন তাদের বাধা দিলে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করে।’
খালেদার মা শাহেন আরা বেগম জানান, সাপে কাটার পর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পাওয়ায় আমার মেয়ে খালেদা বাকশক্তি হারিয়ে বোবা হয়ে গেছে। আমরা পরিবারের সকলে মিলে অনেক চেষ্টা করলেও খালেদা কোনভাবেই কথা বলতে পারছে না। চিকিৎসকরাও এ বিষয়ে তেমন কোন আশ্বাস দেননি।
এদিকে গৃহবধূ খালেদার স্বামী লিখন খান তার পরিবারের বিরুদ্ধে আনিক অভিযোগ অস্বীকার করে সামাজিক যোযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে লিখেন, ‘২০১৬ সালে খালেদা ইসলাম অমির সাথে আমার বিয়ে হয়। আমার সংসারে এক কন্যা সন্তান রয়েছে। বাড়িতে আমার পরিবার ও আমার বৃদ্ধ মা এবং আমার ভাই বসবাস করে। আমার পরিবারের চার বোন বিবাহিত। তারা তাদের সংসারে বসবাস করে। গত ৮ আগস্ট আমার স্ত্রী মুরগি থাকার ঘর পরিষ্কার করতে গেলে তাকে সাপে কামড় দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে আমার ছোট ভাই ও বড় বোন তাকে পরশুরাম হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং তারা আমাকে বিষয়টি অবগত করলে আমি উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে নেয়ার ব্যবস্থা করি। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসার পথে আমার শাশুড়ি ও স্ত্রীর বড় বোন শারমিনের পরামর্শে তাকে তাদের বাড়িতে নেয়া হয়। পরবর্তীতে আমার মা-ভগ্নিপতি-বোন-ভাগিনা আমার স্ত্রীকে তাদের বাড়িতে দেখতে গেলে তারা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। এতে তারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। আমি আমার শাশুড়ি ও জেঠাসের পরিবারকে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করে আসছি। বিগত কয়েক মাস যাবত আমার শাশুড়ি নানা অজুহাতে মোটা অংকের টাকা দাবি করে। আমি তা দিতে অস্বীকার করায় তারা আমার স্ত্রীকে ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র শুরু করে। শুধুমাত্র টাকার জন্য তারা আমি ও আমার পরিবারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা, বানোয়াট, তথ্যচিত্র বানিয়ে প্রচার করছে।’
অপরদিকে জেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহায়’র সভাপতি মঞ্জিলা আক্তার মিমি জানান, ‘গৃহবধূ খালেদা ইসলাম অমির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন রাজধানীর শমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশিষ্ঠ চিকিৎসক এ.বি.এম.হারুন। মঙ্গলবার সহায়’র একটি দল অ্যাম্বুলেন্সে করে গৃহবধূ খালেদাকে ফুলগাজী থেকে শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যাবে। সেখানে তার উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হবে।’
এদিকে গৃহবধূ খালেদাকে নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় খবর পেয়ে পুলিশ সুপার খোন্দকার নূরুন্নবীসহ জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ফুলগাজীতে গিয়ে খালেদার পরিবারের সাথে দেখা করেন। পুলিশ সুপার এসময় খালেদার পরিবারকে মামলা করার নির্দেশ দিলে গত শুক্রবার রাতে থানায় মামলা দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন ওসি।
ফুলগাজী থানার ওসি এএনএম নুরুজ্জামান আরও জানান, গৃহবধূ নির্যাতন ও বাড়িতে হামলার ঘটনায় মামলার দায়েরের পর পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। মামলার সকল আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে বলেও তিনি জানান।