স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
‘মেস যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় তখন তড়িঘড়ি করে আমি বাড়ি চলে আসি। যে কারণে দ্বিতীয়বার মেডিকেল কোচিংয়ের জন্য ট্রাঙ্কের ভেতরে রাখা ১৮ হাজার টাকা সঙ্গে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু ক’দিন আগে মেসে গিয়ে দেখি চোরেরা ট্রাঙ্ক ভেঙ্গে সেই টাকা চুরি করেছে।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন গোাবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা গোলাপ পাল। তার আরও কষ্ট হলো- তিনি যে ওই পরিমাণ টাকা মেসে রাখতে পারেন সেটা কেউ বিশ্বাসই করতে চাইছে না। আর ভবিষ্যতে ক্ষতি হতে পারে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে থানা-পুলিশ করতেও নিষেধ করা হয়েছে।
বগুড়ায় বন্ধ থাকা মেসগুলোতে চুরির ঘটনা বেড়েছে। সংঘবদ্ধ চোরেরা দরজার তালা ভেঙ্গে মেসে ঢুকছে এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ট্রাঙ্কসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভেঙ্গে টাকা-পয়সা লুট করছে। এতে শিক্ষার্থীরা রীতিমত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে লকডাউন সত্তে¡ও মেসগুলোতে গিয়ে তাদের রেখে যাওয়া মূল্যবান জিসিপত্র নিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, মেস মালিকদের উদাসীনতার কারণেই চুরির ঘটনাগুলো ঘটছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার জন্য মালিকদের অনুরোধ করা হলে তারা তাতে কর্ণপাত না করে উল্টো চুরির ঘটনাগুলো কাউকে না জানাতে রীতিমত শাসাচ্ছেন।
বগুড়ায় সরকারি আজিজুল হক কলেজের নতুন ভবন সংলগ্ন কামারগাড়িসহ পাশের সেউজগাড়ি, জহুরুলনগর, পুরান বগুড়া এলাকা এবং শহরের ফুলবাড়িতে অবস্থিত উচ্চ মাধ্যমিক ভবন সংলগ্ন ফুলবাড়ি এবং বৃন্দাবনপাড়ায় ব্যক্তি মালিকানাধীন ছোট-বড় প্রায় ২ হাজার মেস গড়ে উঠেছে। টিন শেড অথবা বহুতল ভবন বিশিষ্ট এসব মেসে আজিজুল হক কলেজ ছাড়াও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ হাজার শিক্ষার্থী অবস্থান করে পড়ালেখা করেন।
গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এর পরই শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সামাজিক বিচ্ছিন্নকরণ নিশ্চিত করতে বগুড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ১৯ মার্চের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মেস ত্যাগ করতে বলা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়ি ফিরে যান। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে ভেবে অনেক শিক্ষার্থী তাদের কোচিং ফি, টিউশন ফি এবং বাজার খরচের টাকাসহ প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসপত্র মেসে রেখেই বাড়ি চলে যান।
সেউজগাড়ী পালপাড়ার প্রিন্স ছাত্রাবাসের গোলাপ পাল জানান, কয়েকদিন আগে তিনি তার ভাইকে নিয়ে মেসে গিয়ে দেখেন তার রুমের বাইরে সব ঠিক ছিল। কিন্তু ভেতরে ট্রাঙ্কের তালা ভাঙ্গা ছিল। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়দফা মেডিকেল কোচিংয়ের জন্য আমি যে ১৮ হাজার টাকা ট্রাঙ্কে রেখেছিলাম তা পাইনি। এ বিষয়ে থানায় অভিযোগও দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবার থেকে থানা-পুলিশ না করতে বলায় আমি পরে চলে আসি।’
নরোত্তম কুমার নামে অপর শিক্ষার্থী জানান, গোলাপ পালের রুমে চুুরি হওয়ার খবর শুনে তিনি গত ১ মে ওই মেসে যান। তিনি বলেন, ‘আমার রুমের ট্রাঙ্কের ভেতর রাখা ৬ হাজার টাকা ও ১০টি প্রাইজবন্ড নেই। আমরা এ চুরির বিষয়ে অভিযোগ দিতে গেলে মেস মালিক কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো গালিগালাজ করেন।’ কামারগাড়ি এলাকার ‘মুক্তি ভিলা’ নামে একটি মেসে থাকা সুবর্ণা নামে এক শিক্ষার্থী জানান, তাদের মেসে দুই দফায় চুরি হয়েছে। প্রথমে নিচ তলার রুমগুলোর তালা ভেঙ্গে চুরি করা হযেছে। পরে দোতলার জানালার কাঁচ ভেঙ্গে বালিশ আর তোষক বাদে সবকিছুই চুরি করা হয়েছে।
সেউজগাড়ি পালপাড়া এলাকার প্রিন্স ছাত্রাবাসে চুরির বিষয়ে ওই মেসের মালিক আকরাম আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চুরির ঘটনা অস্বীকার করেন। পরে তার ছেলে পরিচয়দানকারী এক ব্যক্তি চুরির বিষয় নিয়ে কেন খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে- তা জানতে চেয়ে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন।
বগুড়া সদর থানার ওসি এস এম বদিউজ্জামান জানিয়েছেন, সেউজগাড়ির একটি মেসে চুরি হয়েছে বলে একজন শিক্ষার্থী অভিযোগ নিয়ে এসেছিলেন। তবে পরে সেই শিক্ষার্থী অভিযোগ করবেন না বলে চলে যান। তিনি বলেন, ‘মেসগুলোর নিরাপত্তার দায় কোনভাবেই মালিকরা এড়াতে পারেন না। তারপরেও আমরা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখছি।’