স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
বিশেষ তহবিলের টাকায় কেনা যাবে ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার
বিনিয়োগের বিকল্প না থাকায় শেয়ারবাজারে আসছেন সঞ্চয়কারীরা
সূচক সাড়ে ৬ হাজার পয়েন্টে যাওয়ার সুযোগ আছে- মির্জ্জা আজিজুল
বিনিয়োগকারীদের স্রোতে গা ভাসানো যাবে না- বিএমবিএ সভাপতি
সরকারের ওপর মহলের হস্তক্ষেপে দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে দেশের শেয়ারবাজারে। নিষ্ক্রিয় থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ও বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাজারে সক্রিয় হয়েছেন। ফলে প্রতিদিনই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ। বাজারের এই অবস্থাকে স্বাভাবিক বলছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। ফলে বাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক সাড়ে ৬ হাজার পয়েন্টে যাওয়া স্বাভাবিক।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলো ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারবে। এই তহবিলের যে টাকা বিনিয়োগ হবে তা ব্যাংকের নরমাল বিনিয়োগের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
‘কাজেই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। এখন তারা শেয়ার কিনছেন। সে কারণে সূচক বাড়ছে। এটা কতদিন স্থায়ী হয় সেটাই দেখার বিষয়। আমি মনে করি, ছয় হাজার বা সাড়ে ছয় হাজার পয়েন্ট পর্যন্ত সূচকের যাওয়ার সুযোগ আছে। সুতরাং সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তবে বিনিয়োগকারীদের দেখে-শুনে বিনিয়োগ করতে হবে। জাঙ্ক (স্বল্প মূলধনী কোম্পানির শেয়ার) শেয়ারে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না।’
শেয়ারবাজারের এই বিশ্লেষক বলেন, সঞ্চয়কারীদের এখন বিনিয়োগের খুব একটা জায়গা নেই। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকে আমানত রাখলে ৬ শতাংশ মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সুতরাং তাদের বিনিয়োগের বিকল্প জায়গা না থাকায় শেয়ারবাজারে আসছে।
বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে সবসময় ঝুঁকি থাকে। সেভিংস ইন্সট্রুমেন্টে বা ব্যাংকে আমানত রাখলে ঝুঁকি নেই। কিন্তু ওইসব জায়গায় (সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত) এখন মুনাফা কমে গেছে। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারে ফিরে আসছেন।
শেয়ারবাজারের অব্যাহত পতনের মধ্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু শর্তসাপেক্ষ ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। নিজস্ব উৎস অথবা ট্রেজারি বিল বন্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৫ শতাংশ সুদে এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে ব্যাংকগুলো, যা পরিশোধের সময় হচ্ছে পাঁচ বছর। আর ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে ঋণ দিতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই সুবিধা দেয়ার পর সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া পাঁচ কার্যদিবসেই মূল্য সূচক বেড়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিদিনই আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে। এতে ডিএসইর লেনদেন প্রায় হাজার কোটি টাকার কাছে চলে এসেছে। আর পাঁচ কার্যদিবসের টানা উত্থানে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ৩৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৪ হাজার ৭৬৮ পয়েন্টে উঠে এসেছে। এমন উত্থানের কারণে মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ২১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
বাজারের এ চিত্র সম্পর্কে ডিএসই’র পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটা বাজারের জন্য বড় ধরনের সুখবর। এতে বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। যার প্রতিফলন এখন বাজারে দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন পক্ষের হস্তক্ষেপে শেয়ারবাজারে দুর্বল কোম্পানির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) বন্ধে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বাজারে দুর্বল কোম্পানির আইপিও আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। যা শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের বড় উত্থানকে স্বাভাবিকভাবে দেখছেন কি— এমন প্রশ্ন করা হলে মিনহাজ মান্নান বলেন, টানা পতনে অনেক ভালো শেয়ার ন্যায্যমূলের নিচে নেমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারের উত্থান হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা শেয়ারবাজারে যেমন অস্বাভাবিক পতন চাই না, তেমনি অস্বাভাবিক উত্থানও কাম্য নয়। আমি মনে করি, শেয়ারবাজার স্বাভাবিক উত্থান-পতনের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সভাপতি মো. ছায়েদুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা যুগোপযোগী একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ব্যাংকগুলোকে ২০০ কোটি টাকার যে বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ দেয়া হয়েছে, তাতে বাজারে পর্যায়ক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাজারে যে তারল্য সংকট ছিল তা কেটে যাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, স্রোতে গা ভাসানো যাবে না। তাদের জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। কারও দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তথ্য ভালো করে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে পুরো বাজার পর্যালোচনা না করে তার বিনিয়োগের জায়গাটা কেমন সেটি পর্যালোচনা করতে হবে।
বিশেষ তহবিলের টাকায় কেনা যাবে ১৮৭ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার