স্টাফ রিপোর্টার
ঈদের আনন্দ, ছুটির আমেজ আর পরিবার-পরিজনের সঙ্গে একটু স্বস্তির সময় কাটানোর ইচ্ছায় এবারও দর্শনার্থীদের ঢল নেমেছে বগুড়ার ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে। আর সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে বগুড়ার গোকুলে অবস্থিত প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী “বেহুলার বাসর ঘর” বা গোকুল মেধ।
ঈদের ছুটির দিনগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দর্শনার্থীরা পরিবার, বন্ধু কিংবা স্বজনদের নিয়ে ছুটে আসছেন ইতিহাস আর লোককথার মিশেলে গড়ে ওঠা এই অনন্য নিদর্শন দেখতে।
কেউ এসেছেন ঘুরতে, কেউ ছবি তুলতে, আবার কেউবা ইতিহাসকে কাছ থেকে অনুভব করতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর গড়াতেই বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম। ভরদুপুরের রোদ এড়িয়ে বিকেলের নরম আলো আর মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে দর্শনার্থীদের আগ্রহ বেশি। সবুজ ঘাসে মোড়ানো চারপাশ, উঁচু ঢিবির মতো গড়ে ওঠা প্রাচীন স্থাপনা আর খোলা আকাশ-সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম প্রশান্তি।
বগুড়ায় বেহুলার বাসর ঘরঅনেকে আবার দলবেঁধে পিকনিকের আনন্দেও মেতে উঠেছেন। শিশুদের দৌড়ঝাঁপ, তরুণদের আড্ডা আর পরিবারগুলোর আনন্দঘন মুহূর্তে পুরো এলাকা যেন উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। দর্শনার্থীরা মোবাইল ফোনে কিংবা ক্যামেরায় বন্দি করছেন তাদের আনন্দের স্মৃতি।
স্থানীয়ভাবে “বেহুলার বাসর ঘর” নামে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো বাসর ঘর নয়। এটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসাবশেষ, যা বর্তমানে গোকুল মেধ নামে পরিচিত।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে এখানে ১৭২টি বন্ধ প্রকোষ্ঠের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ১৩ মিটার উঁচু একটি মঞ্চের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, প্রথম নির্মাণ পর্যায়ে এখানে একটি বৌদ্ধ উপাসনালয় ছিল। পরে সেন আমলে এর ওপর নির্মিত হয় বর্গাকৃতির একটি শিব মন্দির।
খননকাজে এখানে পাওয়া গেছে নর কঙ্কাল, ইটের তৈরি গোলাকার গর্ত, শিলাখণ্ড, ষাঁড়ের প্রতিকৃতি উৎকীর্ণ স্বর্ণপত্রসহ নানা প্রত্ন নিদর্শন। এসব নিদর্শন ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কাছে স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে লোকমুখে এই স্থান জড়িয়ে আছে বেহুলা-লখিন্দরের চিরন্তন প্রেমকাহিনি। অনেক দর্শনার্থী এখনো বিশ্বাস করেন, চাঁদ সওদাগর তার ছেলে লখিন্দর ও পুত্রবধূ বেহুলার জন্য এই বাসর ঘর নির্মাণ করেছিলেন।
বগুড়ায় বেহুলার বাসর ঘরে দর্শনার্থীনাটোর থেকে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শওকত আলী বলেন, ছোটবেলা থেকেই বইয়ে বেহুলা-লখিন্দরের গল্প পড়েছি। আজ সরাসরি এসে দেখার সুযোগ হলো। সত্যিই অনেক ভালো লাগছে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা মেহজাবিন বলেন, প্রথমবার বগুড়ায় মহাস্থানগড় দেখতে এসেছি। এখানে এসে যদি বেহুলার বাসর ঘর না দেখতাম তাহলে ভ্রমণটাই অসম্পূর্ণ থেকে যেত। জায়গাটি অনেক পুরোনো হলেও এখনো দারুণভাবে টিকে আছে। সরকার যদি আরও যত্ন নেয় তাহলে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।
আরেক দর্শনার্থী আবেগ প্রকাশ করে বলেন, ভাবতেই অবাক লাগে, এত বছর আগে এত সুন্দর একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছিল। চাঁদ সওদাগর তার ছেলে লখিন্দর আর বেহুলার জন্য এত সুন্দর বাসর ঘর বানিয়েছিলেন-এটা সত্যিই অসাধারণ মনে হয়। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে বেহুলার বাসর ঘর। প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৩০ টাকা।
বগুড়া শহরের যেকোনো স্থান থেকে মহাস্থানগড় বা উত্তরবঙ্গগামী বাসে উঠে গোকুল কিংবা চাঁদমুহা বাসস্ট্যান্ডে নামতে হয়। সেখান থেকে রিকশা বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সহজেই পৌঁছানো যায় ঐতিহাসিক এই স্থাপনায়।
ঈদের ছুটিতে যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা থেকে একটু স্বস্তি পেতে মানুষ এখন খুঁজছেন প্রকৃতি আর ইতিহাসঘেরা উন্মুক্ত পরিবেশ। সেই চাহিদা পূরণে বগুড়ার বেহুলার বাসর ঘর হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণকেন্দ্র।
ইতিহাস, লোকগাথা, প্রকৃতি আর আনন্দ সব মিলিয়ে এই প্রত্নস্থল শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক।