সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। বিভিন্ন পদ্ধতিগত ও আইনি জটিলতার কারণে অর্থ উদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগে। অর্থ পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ অত্যন্ত দুরূহ বিষয়।
আজ মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির মসিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়। অর্থ পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা, গবেষণা সংস্থা বিভিন্ন ধরনের মেথডোলজি ব্যবহার করে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে প্রাক্কলন করে। যার যথার্থতা ওইসব প্রতিষ্ঠানও দাবি করে না। এসব সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ হতে কী পরিমাণ অর্থপাচার হয় সে বিষয়ে পরস্পর বিরোধী তথ্য দেখা যায়। বস্তুত, অর্থপাচারের পরিমাণ নির্ধারণ অত্যন্ত দুরূহ বিষয়। তবে দেশ থেকে অর্থপাচারের মাত্রা বা পরিমাণ যাই হোক না কেন, পাচারের সম্ভাব্য উৎসগুলো বন্ধ করার পাশাপাশি অর্থপাচার রোধ এবং পাচারকৃত অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে সরকারের সব বিভাগ একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
সরকারের পদক্ষেপে অবৈধ অর্থ পাচার আগামীতে অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করে মুস্তাফা কামাল বলেন, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। বিভিন্ন পদ্ধতিগত ও আইনি জটিলতার কারণে অর্থ উদ্ধারে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) পাচারকারী বা পাচারকৃত অর্থের বিষয়ে বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থাকে সরবরাহ করে আসছে। বিদেশে (যথা–সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ইত্যাদি) ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনা অথবা অন্য কোনও পদ্ধতিতে অর্থ পাচার বিষয়ক বেশকিছু মামলা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) দায়েরকৃত পাচার সংশ্লিষ্ট বেশকিছু মামলা চলমান রয়েছে। অন্যদিকে, বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ বাংলাদেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে এটর্নি জেনারেল মহোদয়ের নেতৃত্বে আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অপরাধ সম্পর্কিত বিষয়ে পারস্পরিক সহায়তা দিতে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ (Central Authority) হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির বেগম লুৎফুন নেসা খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণ জিডিপির শতকরা হার অনুযায়ী বাংলাদেশ ঝুঁকি সীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে। দেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকিমুক্ত ও সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় কোনও ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। আইএমএফের প্রতিবেদনের উদ্বৃতি দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০৩২ সাল পর্যন্ত দেশীয় ঋণসহ বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ–এর মতে বৈদেশিক ঋণ জিডিপির ঝুঁকিসীমা সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বলে এ প্রশ্নের উল্লেখ করেন মন্ত্রী। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ২০১৬–১৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির অনুপাত ছিল ১২ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২১–২২ অর্থ বছরে ছিলো ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই ৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্ছ ছিল ২০২০–২১ অর্থ বছরে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ওয়ার্কার্স পার্টির বেগম লুৎফুন নেসা খানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের মেয়াদে ঋণ খেলাপীর দায়ে ২১৭ জনকে জেলে পাঠানো হয়েছে। ঋণ খেলাপীর দায়ে ১২জন কৃষককে জেলে নেওয়ার ঘটনাটি (পাবনায়) বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতাভুক্ত কোনও তফসিলি ব্যাংক নয়। আদালতের এখতিয়ারভুক্ত ঋণ খেলাপির দায়ে জেলে পাঠানোর ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
সংরক্ষিত আসনের নাজমা আকতারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান নীতিমালা আলোকে কৃষি ঋণ ছাড়া সব প্রকার ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। কৃষি ও পল্লী ঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ। আমানতের ওপর ব্যাংক সাধারণত ৬ শতাংশ হারে সুদ প্রদান করে থাকে। মামুনুর রশীদ কিরণের প্রশ্নের জবাবে মুস্তাফা কামাল বলেন, চলতি ২০২২–২৩ অর্থ বছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের ৩০ হাজার ৯১১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত ১২ হাজার ৭৭৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণের হার ৪১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
সরকারি দলের নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, গত ১১ মাসে (জানুয়ারি–২০২২ হতে নভেম্বর ২০২২) ১৯ হাজার ৫৮৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সরকারি দলের মোহাম্মদ হাবিব হাসানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তাফা কামাল বলেন, কৃষি ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ২৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা।