শিরোনাম :
রাজনীতি আমাদের পেশা নয়, কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করছি : জামায়াত আমির কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের ফ্ল্যাট দেওয়ার আশ্বাস তারেক রহমানের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর গোটা পৃথিবীর এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত বগুড়ায় গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে ভোক্তা অধিকারের অভিযান দশ হাজার জরিমানা বগুড়ায় আমীরে জামায়াতের জনসভা সফল করতে ১০ দলীয় জোটের সভা শিবগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমানের ৯০ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে চূড়ান্ত বৈধ প্রার্থী ৭ জন শিবগঞ্জে অবৈধ মাটি মহলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা শাজাহানপুরে মোটরসাইকেল-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত কিশোরের অবস্থা আশঙ্কাজনক

মধ্যবিত্ত না পারছে বলতে না পারছে সইতে

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
  • আপডেট সময় রবিবার, ২০ মার্চ, ২০২২

ঘটনা-১ : জাফর ইকবাল (৪৫)। জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাইয়ে। করোনা মহামারির সময় কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসেন। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন গ্রামের বাড়িতে। করোনার ধাক্কা দীর্ঘায়িত হওয়ায় ব্যবসায়ে মন্দা। সংসার খরচ চালিয়ে পুুঁজি বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। তাই ব্যবসা বন্ধই করে দিয়েছেন প্রায় তিন মাস হলো। এরইমধ্যে বেড়েছে পরিবহন খরচ, বাচ্চাদের স্কুলের বেতন, স্বাস্থ্যসেবার খরচও তো আগে থেকেই লাগামহীন। ফিরে আসা প্রবাসী হিসেবে সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। আর মধ্যবিত্ত শ্রেণির হওয়ায় পাচ্ছেন না সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কোনো সুবিধাও। নিজের অভাব-অভিযোগ আর কষ্টের কথা কারও সঙ্গে শেয়ারও করতে পারছেন না। আবার কারও কাছে হাতও পাততে পারছেন না। এ উভয় সংকটের মধ্যেই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে সয়াবিন তেল, চাল, ডাল, চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। তার মতে, গত দুই বছরে দেশে যে হারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তাতে দুবাইয়ের জীবনও এর চেয়ে সস্তা ছিল।

ঘটনা-২ : একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত রাজীব (৩৫)। গত বছর করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন অনেক দিন। তখনো খরচ হয়েছে অতিরিক্ত। ১৫ বছরের চাকরিজীবনে এবারের মতো আর্থিক সংকটে পড়েননি কখনোই। আয়- ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে বাসা বদল করেছেন সম্প্রতি। আগে ২৫ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিতেন। দুই মাস হলো ২০ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছেন। আগের বাসার চেয়ে নতুন বাসার সুযোগ-সুবিধা কিছুটা কমেছে। এদিকে বাচ্চাদের স্কুলের খরচ ও নিজের যাতায়াত খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু কোথাও থেকে কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। ফলে খাওয়া-দাওয়াসহ জীবনযাত্রার খরচ কমিয়ে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের মাত্র ১০-১৫ ভাগ মানুষ ধনী ও অতি ধনী। বাকি ৮৫ ভাগের মধ্যে প্রায় ২২ ভাগ দরিদ্র। বেসরকারি হিসাবে যা করোনা মহামারিতে ৪০ শতাংশে উঠে গেছে। যদিও সরকারের হিসাবে গরিব মানুষের সংখ্যা এখনো ২২ শতাংই। সে হিসাবে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০-৬৫ ভাগই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। এদিকে ‘অতি ধনী’র সংখ্যা বৃদ্ধির দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশও। অবশ্য বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, কভিড-১৯ এর ধাক্কায় বাংলাদেশের দুই দশকের দারিদ্র্য হ্রাসের নিয়মিত গতিকে উল্টোমুখী করেছে। দেশটিতে এখন ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এদিকে আসন্ন রোজায় এক কোটি মানুষকে খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সে তালিকায় নেই মধ্যবিত্তের কোনো নাম।
এ ছাড়া বছরজুড়ে সরকারের দারিদ্র্যবান্ধব সব কর্মসূচিই ২২ শতাংশ দরিদ্র বা গরিব শ্রেণির মানুষের জন্য কার্যকর থাকে। ফলে ৬৫ শতাংশ মানুষ সরকারি কোনো সহায়তার আওতায় থাকে না। আবার তারা নিজেদের অভাব-অভিযোগের কথা কারও কাছে বলতেও পারেন না মান-সম্মানের ভয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ শ্রেণির মানুষ সব সময় উভয় সংকটের মধ্যে দিন কাটান। তারা নিজেদের আর্থিক চাহিদা নিজেরা মেটাতে পারেন না। আবার সরকারি বা বেসরকারি সহায়তাও পান না। এ জন্য এ শ্রেণির মানুষের জন্য রেশন পদ্ধতি চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে কাজ দিতে না পারলে দারিদ্র্যসীমা ভয়াবহ রূপ নেবে। এতে আমাদের সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হবে। কেননা করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে টানা লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বেশিরভাগই কর্মজীবীর আয়ও কমেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রায় সব মানুষেরই নাভিশ্বাস উঠেছে জীবন চালাতে। সংসার চালাতে না পেরে অনেকেই ঢাকা ছেড়েছেন, ছাড়ছেন। করোনার প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির ধসে পড়েছে। লোকসান গোনার আশঙ্কায় বড় বড় অনেক কোম্পানি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। আবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। সচল হয়েছে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না পণ্যমূল্য। বিশেষ করে চাল, ডাল, তেল, চিনি, মাছ, মাংস, পিঁয়াজ, রসুন এসব পণ্যের দাম বাড়ছে। সরকার দর বেঁধে দিলেও মানছে না কেউই।

বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের চার কোটি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ ভাগ আর উচ্চবিত্ত ২০ ভাগ। মাঝের যে ৬০ ভাগ এরা নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত। এ সংখ্যা আড়াই কোটি পরিবার হবে। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী, মাল্টিন্যাশনাল ও বড় কোম্পানিতে কাজ করা কিছু মানুষ বাদে অন্য সবাই এখন চরম সংকটে আছেন। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে আছেন। অনেকেরই নিয়মিত বেতন হয়নি, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আবার যারা দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই এখন কর্মহীন। এছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী মানুষ তো আরও বেশি কষ্টে রয়েছে। তাদের সংকট আরও অনেক বেশি।

ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির ফলে অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়েছেন। দেশের বেশিরভাগ মানুষেরই আয় কমেছে। করোনার প্রথমদিকের সময়গুলোতে মানুষ ধার-কর্জ করেছে বা সঞ্চয় ভেঙে জীবন চালিয়েছে। এখন কিন্তু সেই অবস্থা নেই। ধার-কর্জ করারও জায়গা নেই অনেকের। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে খাবার কম খাচ্ছে। অনেকেই কুলাতে না পেরে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনছে। কেউ কেউ বাসা বদল করে নিম্নমানের বাসায় উঠছে। যাতে খরচ কমানো যায়। তবে এখানে সরকারের আরও অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023