আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস
বন থেকে ভূমি বানানো সেই আদিবাসীদেরই মজুরি কম
রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় সোমবার, ৯ আগস্ট, ২০২১

মুক্তজমিন ডেস্ক

অন্তত ১২০ বছর আগে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাবনার ঈশ্বরদীতে নিয়ে আসা হয় অনেক শ্রমজীবী মানুষকে। তাদের দিয়ে বন-জঙ্গল পরিস্কার করে বাসযোগ্য ভূমিতে রূপান্তর করা হয়। তেমনি একটি অঞ্চল রূপপুর, যেখানে এখন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব আদিবাসীর শ্রমে, ঘামে এ অঞ্চলে তৈরি হয় সমতল জনপদ। তারাও আর ভারতে ফিরে যাননি। ঘটনার এত বছর পরও বিভিন্ন কাজে মজুরি বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। সাধারণ বাঙালিরা যেখানে দৈনিক পাঁচশ টাকা মজুরি পান, সেখানে আদিবাসীদের দেওয়া হয় সাড়ে চারশ টাকা।

 

নারী শ্রমিকরা আরও বৈষম্যের শিকার। পুরুষের সমান কাজ করেও তারা পান সাড়ে তিনশ টাকা। মজুরি বৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে কাজ থেকে বিতাড়নের হুমকি আসে। এমন পরিস্থিতিতে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়, আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নতুন সামাজিক অঙ্গীকারের আহ্বান’।

 

আদিবাসীরাই এই এলাকাকে জঙ্গল থেকে লোকালয়ে রূপান্তর করেছেন উল্লেখ করে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, পদ্মা নদী ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ জানান, ১৯০০ সালের পরপরই ভারতের পশ্চিম বাংলা, বিহার, ঝাড়খন্ডসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আদিবাসীদের ঈশ্বরদীতে বন সাফ করতে নিয়ে আসা হয়। সেসব কাজের পাশাপাশি পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ বানানোর কাজ শুরু হলে নির্মাণস্থানের নিরাপত্তায়ও নিয়োজিত করা হয় তাদের। এই ব্রিজ নির্মাণে শ্রমিক হিসেবেও কাজ করেন অনেক আদিবাসী। এতকিছু করেও ভাগ্য বদলায়নি তাদের। যে আদিবাসীরা জঙ্গল কেটে বাসযোগ্য করেছেন গ্রামের পর গ্রাম, তাদের অনেকেরই এখন নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের জমিতে ভাড়া থেকে তাদের জীবন-জীবিকার সংস্থান করতে হয়। কাজেও ঠকতে হচ্ছে পদে পদে।

 

পাকশীর গুড়িপাড়ার আদিবাসীদের সরকারি গেজেটে ‘তুরি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে তারা নিজেদের ‘সাহানি’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। নিজেদের ‘পশ্চিমা’ বলে দাবি করা এ পাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি অশোক সাহানি বলেন, ‘আমাদের কথা কেউ শোনে না।’

 

উপজেলার পতিরাজপুরের আদিবাসী পল্লির প্রবীণ বাসিন্দা ভবেশ চন্দ্র সরদার বলেন, ‘একশ বছরেরও বেশি সময় আগে পশ্চিম থেকে আমার পূর্বপুরুষরা এই এলাকায় বন-জঙ্গল সাফ করে বসবাস শুরু করেন। তখন আমাদের নিজেদেরই জমি-জমা ছিল। এখন আমরা সেই জমি হারিয়ে অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। তাও কম মজুরিতে সন্তুষ্ট থাকতে হয় আমাদের।’

 

মাড়মি গ্রামের আদিবাসী নারী কৃষিশ্রমিক বিনতা পাহাড়ী ও শেফালী বিশ্বাস জানান, পুরুষ সহকর্মীদের তুলনায় আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা আগে থেকে কাজ শুরু করেন তারা। আবার শেষ বিকেলে পুরুষ শ্রমিকদের কাজ ফুরালেও তাদের আরও কিছুটা সময় কাজ করতে হয়। ঈশ্বরদীর বিভিন্ন মাঠে কৃষিকাজ করা দুই শতাধিক আদিবাসী নারীর প্রতিদিনের ধরাবাঁধা রুটিন এটা। এসবের পরও দিন শেষে তারা মজুরি পান পুরুষদের চেয়ে অনেক কম।

 

গতকাল রোববার উপজেলার ইস্তা গ্রামের ধানক্ষেতে কর্মরত ডহরশৈলা গ্রামের আদিবাসী নারী কৃষিশ্রমিক রুনা বিশ্বাস, কর্মারানী বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন এলাকা থেকে প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে কাজে আসতে হয় তাদের। পুরুষ শ্রমিকরা দিন শেষে পাঁচশ টাকা হাজিরা (মজুরি) পান। অথচ তাদের দেওয়া হয় সাড়ে তিনশ টাকা। কাজ না করলে চুলায় হাঁড়ি ওঠে না। তাই কম পেয়েও কাজ করতে বাধ্য হন তারা।

 

পাশের আরেকটি মাঠে কাজ করছিলেন স্থানীয় শ্রমিক আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বরদীর সব এলাকাতে এখন পাঁচশ টাকার নিচে শ্রমিকের কোনো মজুরি নাই। আমি নিজেও এই মজুরিতে কাজ করি।’

 

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কৃষকরা উপজেলার মাড়মি, পতিরাজপুর, ডহরশৈলা ও বাইপাস স্টেশন এলাকা থেকে এসব আদিবাসী নারীকে এনে কম হাজিরায় কাজ করান। স্থানীয় কৃষক আজিবর রহমান বলেন, ‘ওদের হাজিরা কম, তাই আমরা তাদের কাজে লাগিয়েছি। মহিলা মানুষ বলে হাজিরা কম দেই, এতে দোষের কী আছে?’

 

এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি অবহেলা কিংবা নারীকে অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে যদি কেউ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন, তবে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023