স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
বেশ কিছু অভিযোগের পর সম্প্রতি দ্বৈত ভোটারদের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইতোমধ্যে ৯৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে এমন কঠোরতার মধ্যেও ছাড় পেতে পারেন কিছু দ্বৈত ভোটার। এক্ষেত্রে যাদের ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ ছিল না, তাদের ক্ষমা করে আরেকটি সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ।
সম্প্রতি ভোটার আইডি কার্ডে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এবং দ্বৈত ভোটার হয়ে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে দ্বৈত ভোটার হয়ে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এতে নড়েচড়ে বসে নির্বাচন কমিশন। এরপরই এনআইডি উইং চিহ্নিত করে অসংখ্য দ্বৈত ভোটার। আর তাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলারও নির্দেশনা দিয়েছে ইসি। তবে দ্বৈত ভোটারদের মধ্যে অনেকেই নিজের অজান্তেই দুইবার ভোটার হয়েছেন। এর মধ্যে যাদের ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ ছিল না, এনআইডি অনুবিভাগ তাদের আরেকবার সুযোগ দিতে যাচ্ছে।
অনুবিভাগটির কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত অনেকেই নিজের অজান্তে দুইবার ভোটার হয়ে যান। স্থান পরিবর্তন, বয়স সংশোধন, আইডি হারিয়ে ফেলাসহ নানা কারণে অনেকে না বুঝে দ্বিতীয়বার ভোটার হয়েছেন। এ ভোটারদের আরেকটি সুযোগ দেয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে এনআইডি উইং। এক্ষেত্রে দ্বৈত ভোটারদের যাচাই-বাছাই করে আলাদা ক্যাটাগরি করা হচ্ছে। যারা না জেনে দ্বৈত ভোটার হয়েছেন, তাদের নিয়ে একটি ক্যাটাগরি করা হবে এবং যারা ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে’ করেছেন তাদের নিয়ে একটি ক্যাটাগরি করা হবে। এরপর এটি কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। কমিশন সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এনআইডি অনুবিভাগ।
এ বিষয়ে এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, দ্বৈত ভোটারদের আমরা চিহ্নিত করছি। তাদের মধ্যে ৯৩৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য কমিশন থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করছি। তাদের উদ্দেশ্য কী ছিলে সেটা নিখুঁতভাবে বের করা দরকার। একজন ১৮ বছর বয়সী ব্যক্তি যদি আবার ১৯ বছরে এসে দ্বৈত ভোটার হন, কিন্তু আগের কার্ডটি উত্তোলন করেনি বা কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার কাজে ব্যবহার করেনি, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, অথবা কীভাবে তাদের আরেকটা সুযোগ দেয়া যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আমরা এনআইডি থেকে একটি পরিকল্পনা করছি, এটা কমিশনে যাবে। কমিশন অনুমোদন দিলে তারপরে সিদ্ধান্ত।
তিনি আরও বলেন, কেউ এনআইডি করেছেন ১৮ বছর বয়সে, কিন্তু এখন ২৪ বছর অথবা ৩০ বছর বয়সে আবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন বা দ্বৈত ভোটার হয়েছেন এবং আগের এনআইডি সে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেছেন, তখন স্পষ্ট— তার উদ্দেশ্য খুবই খারাপ। সুতরাং আমরা উদ্দেশ্য বের করার চেষ্টা করছি। পরে সেটি যাচাই-বাছাই করে যারা হয়তো না জেনে করেছেন, উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না, সেরকম একটি ক্যাটাগরি করা হচ্ছে। তবে যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই ক্যাটাগরি আমরা এনআইডি উইং থেকে করব। এরপর কমিশনে উপস্থাপন করব। কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যারা ভুল করেছে তাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য না থাকলে আবেদনের প্রেক্ষিতে শাস্তি মওকুফ করার সুপারিশ থাকবে।
দ্বৈত ভোটার সংক্রান্ত মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সম্প্রতি জটিলতায় পড়েন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। দ্বৈত ভোটারদের ক্ষেত্রে কোন থানা নির্বাচন অফিসে মামলাটি করবেন, তা নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়।
চলতি মাসে দ্বৈত ভোটার সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে ইসির মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা হয়। সভায় যুগ্ম-সচিব (আইন) জানান, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে এ সংক্রান্ত দুটি আইন রয়েছে; একটি ভােটার তালিকা আইন, ২০০৯ এবং অপরটি জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০। ভােটার তালিকা আইনে অপরাধসমূহ অ-আমলযােগ্য (নন-কগনিজেবল) হওয়ায় এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে হয় এবং পরবর্তীতে তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে মামলা হয়। তবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইনে এই অপরাধসমূহ আমলযােগ্য। ফলে এ আইনের ধারা অনুসারে থানায় মামলা করা যায়।
সভায় জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মাে. আবদুল বাতেন জানান, মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভােটার হওয়ার স্থান বিবেচ্য হয়, সেক্ষেত্রে এনআইডি অনুবিভাগ থেকে অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে এখানে ভােটার করা হয়েছে। এ স্থানটি যেহেতু মােহাম্মদপুর থানার অধীনে, সেহেতু মামলার ক্ষেত্রে মোহাম্মদপুর থানা নির্বাচন অফিসার ও রেজিস্ট্রেশন অফিসারের বাদী হওয়ার কথা। যেহেতু এক্ষেত্রে ভােটার তার অফিসে বা তার তত্ত্বাবধানে হয়নি, সেক্ষেত্রে মামলার বিষয়ে তার বাদী হওয়ায় অনীহা থাকে। অতএব এ বিষয়ে এনআইডি অনুবিভাগের প্রতিনিধি নাকি মোহাম্মদপুর রেজিস্ট্রেশন অফিসার মামলার বাদী হবেন, সেটা স্পষ্ট করা প্রয়ােজন।
সভায় খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা জানান, দ্বৈত ভােটার হওয়ার তালিকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তাদের বিষয়েও মামলা করার ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা প্রয়ােজন।
সভায় মামলার বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমত, ভােটার তালিকা আইন, ২০০৯ এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০— এ দুটি একত্রে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ধারা মােতাবেক থানায় মামলা করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দি পেনাল কোড, ১৮৬০ এর সংশ্লিষ্ট ৪২০ ধারা, অর্থাৎ প্রতারণার অভিযােগে মামলা করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, কমিশনের অভিপ্রায় মােতাবেক ভােটার তালিকা আইন, ২০০৯ এর অধীনে সংঘটিত অপরাধসমূহ আমলযােগ্য হিসেবে গণ্য করে আইন সংশােধন করা যেতে পারে।
এছাড়া সংশ্লিষ্ট এখতিয়ার সম্পন্ন ফৌজদারি আদালতে সিআর মামলা করা যেতে পারে। মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অপরাধ যেখানে সংঘটিত হয় সেখানে, অর্থাৎ দ্বিতীয়বার ভােটার হওয়ার স্থানে মামলা করতে হবে। এছাড়া কোনো নির্বাচন কর্মকর্তা কখনাে কোনো সমস্যায় পড়লে আইন শাখায় যােগাযােগ করতে পারেন। কোর্টে মামলার ক্ষেত্রে সরকারি উকিলকে ‘প্রাইভেটলি’ নিয়ােগ করা হলে বিধি মােতাবেক তার জন্য ফি প্রদান করা যেতে পারে।
মামলা জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে এনআইডি অনুবিভাগের কমিউনিকেশন ইনচার্জ স্কোয়াড্রন লিডার কাজী আশিকুজ্জামান বলেন, মামলা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কারণ মামলা তো করছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা, ফলে তিনি (দ্বৈত ভোটার) দ্বিতীয়বার যেখানে ভোটার হয়েছেন, সেখানকার নির্বাচন কর্মকর্তা মামলা করবেন। প্রথম জায়গায় যেটা করা হয়েছে সেটি তো অবৈধ না। দ্বিতীবার যেটা করেছেন সেটা অবৈধ। আর দ্বৈত ভোটারদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হবে কি-না সেটি নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন পর্যন্ত দ্বৈত ভোটারদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। ৯৩৭ জনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, দ্বৈত ভোটারদের ক্ষমা করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেয়া হয়নি। দেখা যাক, আমরা হার্ডলাইনে যাবো কি-না। আর এখন দ্বৈত ভোটারের ক্ষেত্রে যেখানে অপরাধটি হচ্ছে বা যেখানে দ্বিতীয়বার ভোটার হচ্ছে সেখানেই মামলা হবে। এ নিয়ে কোনো জটিলতা নেই।