শত অভিযানেও রাশ টানা যাচ্ছে না মাদক সিন্ডিকেটের

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
  • আপডেট সময় সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

মাদকাসক্তি দেশের তরুণ সম্প্রদায় তথা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি। মাদককে সকল অপরাধের মা বলা হয়। মাদক যেখানে রয়েছে, সেখানে অবৈধ অস্ত্র, চোরাচালান, নারী পাচার, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধও দেখা যায়।ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইনের পাশাপাশি বর্তমানে আইস, এলএসডিসহ নতুন কিছু মাদকের প্রচলন দেখা যায়। মাদকবিরোধী অভিযান ও মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের পরও মাদক পাচার থামছে না। বরং মাদক পাচারে নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। অনেক সময় পাচারকারীদের নিত্যনতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল দেখে হতবাক হয়ে পড়েন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরাও।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করে কারবার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মাদকের চাহিদা কমাতে পরিবার থেকে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যারা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, সেসব প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা যেমন বিশেষ প্রয়োজন, তেমনিভাবে আইনি ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক ও শক্তিশালী করা সংশ্লিষ্টদের সচেতন দায়বদ্ধতা।

২০২১ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৯১টি অভিযান পরিচালনা করে ১৫ হাজার ৬৮৫ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয় ১ কোটি ৪৯ লাখ ২৫ হাজার ৩০৪ পিস ইয়াবা, ১৪৩ কেজি হিরোইন, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৬৪৩ বোতল ফেন্সিডিল, ২২ হাজার ৫৩৪ বোতল বিদেশী মদ, ৩৫ হাজার ৯৬৮ কেজি গাঁজা, ৮২ হাজার ১৮ বোতল বিয়ার, প্রায় ৬৭ কেজি আফিম, ৭২ পিস নেশা জাতীয় ইনজেকশন, ১৩৩ পিস ড্রাগ ট্যাবলেটসহ অন্যান্য মাদক দ্রব্য।

বর্তমানে দেশে মাদকাসক্তির নানা উৎস বিদ্যমান। ভাং, আফিম, গাঁজা ইত্যাদি প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলতি ছিলো; কিন্তু বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে ও বর্তমান সময়ে এর যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে মাদকদ্রব্য হিসেবে, ফেনসিডিল, হিরোইন, মারিজুয়ানা, ইয়াবা, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও নতুন মাদক হিসেবে যোগ হয়েছে এলএসডি, ব্রাউনি বা গাঁজার কেক, ক্রিস্টাল মেথ বা আইস, এমডিএমএ, খাট, ব্যথানাশক ট্যাবলেট ট্যাপেন্ডাডল, স্ক্যাফ সিরাপ ও এমফিটামিন পাউডার ককটেল বা ‘ঝাক্কি।

আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, মাদকদ্রব্যের মধ্যে বিশেষ করে হেরোইন, গাঁজা, ইয়াবা এগুলোর বেশির ভাগই সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে বিভিন্ন পন্থায় রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এসব মাদক বিভিন্ন অভিযানে আটক হচ্ছে। তখন দেখা যাচ্ছে, পাচারকারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।

পুলিশ, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসায়ীরা পানের ভাঁজে, কাঠের তক্তায় বিশেষ বাক্সে করে মাদক পাচার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়াতে বেদের দল সেজে ইয়াবা পাচারের মতো ঘটনাও ধরা পড়েছে।

এছাড়া মবিলের ভেতর, প্রাইভেট কার, সিএনজির অটোরিকশার ভেতরে, বাসা পরিবর্তনের কথা বলে বালিশের ভেতর ইয়াবা ও হেরোইন পাচারের মতো কর্মকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়েছে। তাছাড়া অভিনব কায়দায় অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগী সেজে, গুঁড়া হলুদ ও মরিচের প্যাকেটের ভেতর হেরোইন ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এসব বিষয় উঠে আসে।

কাঠের তক্তা তৈরি বক্স বানিয়ে গাঁজা পাচার করছিল মাদক চক্রের সদস্যরা। ২০২১ সালের ৪ ডিসেম্বর র‌্যাবের অভিযানে ২০ কেজি গাঁজাসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটকের পর এমনই তথ্য উঠে আসে।

গত ৩ জানুয়ারি রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার দক্ষিণ কমলাপুর টিটি পাড়া এলাকা অ্যাম্বুলেন্সে করে ১০০ কেজি গাঁজা পাচারের সময় অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান বাংলাদেশ জার্নাকে বলেন, ‌সব ধরনের মাদক সীমান্ত পার হয়ে নানা কৌশলে বাংলাদেশের ঢোকে। এরপর রাজধানীসহ বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার পরেও অনেক মাদক ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায়। হাইওয়ে পুলিশসহ সবাই চেষ্টা করছে মাদকে নিয়ন্ত্রণের। তবে হাজার হাজার গাড়িতে ম্যানুয়ালি চেক করে এতো ধরাও সম্ভব হয় না। আবার কেউ যতি পেটের ভেতর করে বা পায়ুপথে নিয়ে আসে তাহলেও তো খালি চোখে আমরা সেটা ধরতে পারি না। এভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকে তারা।

তিনি আরও বলেন, নির্দিষ্ট তথ্য থাকলে আমরা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করি। তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণ কিভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, দেশের একটা ব্যাপক জনগোষ্ঠী যদি মাদকাসক্ত হয়ে যায় তাহলে শুধু অভিযান চালিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য অভিভাবকসহ সকল শ্রেণির মানুষকে সচেতন হতে হবে। এর

বর্তমানে ইয়াবা, ফেন্সিডিল, গাঁজা, হেরোইনের পাশাপাশি বর্তমানে আইস, এলএসডিসহ নতুন কিছু মাদকের প্রচলন দেখা যায়। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত মাদক হলো আইস বা ক্রিস্টাল মেথ। র‌্যাব ইতোমধ্যে ১৮ কেজি ৬১০ গ্রাম আইস উদ্ধার করে।

র‌্যাব বলছে, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসে ইয়াবার মলূ উপাদানে এমফিটামিনের পরিমান অনেক বেশি থাকে। যা ২০১৯ সালে রাজধানীর জিগাতলা থেকে প্রথমবার উদ্ধার হয়। এরসঙ্গে আরও উদ্ধার হয় এমডিএমএ নামের আরেকটি মাদক তৈরির উপকরণও। রাজধানীর উত্তরা থেকে এই মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা তৌফিকসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

তারা মেথ ল্যাব তৈরি করে ভেজাল আইস, ইয়াবার রং পরিবর্তন, ঝাক্কি মিক্স বা ককটেল মাদক তৈরি করছিল। এছাড়া ‘খাট’ নামের এক ধরনের পাতাও মাদক হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। তাই মানবদেহে ইয়াবার চেয়েও বহুগুণ ক্ষতিসাধন করে এই আইস। এটি সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিস্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার জটিলতা এবং মানসিক অবসাদ ও বিষন্নতার ফলে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রে এটির নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এই মাদকের প্রচলনের ফলে তরুণ-তরুণীদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে এবং অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হয়। এই মাদকে আসক্ত হয়ে মাদকাসক্তরা নানা অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ছে।

এ মাদক দ্রব্যগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসির কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, এই মাদক সেবনের ফলে অনিদ্রা, মানসিক অবসাদ, মস্তিষ্ক বিকৃতি, স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার জটিলতা হয়। আর মাদক এমডিএমএ প্রধানত ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যবহার হয়। এটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকটা এলএসডির মতোই। মাদক খাট সম্পর্কে তিনি বলেন, এর মধ্যে ক্যাথিন ও ক্যাথিনোন নামের দুই ধরনের উপাদান থাকে। যা মাদকের অন্যতম উপাদান।

র‌্যাবের মাদকবিরোধী অভিযান

বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম থানাধীন সদর ইউনিয়নের উত্তর পালং পাড়া এলাকায় ২০২১ সালের ১ অক্টোবর র‌্যাব-৭ এর অভিযানে চার লাখ ৯৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ ২ জন আসামি গ্রেপ্তার। এছাড়াও গত ২৫ ডিসেম্বর কক্সবাজারের বালুখালী উখিয়ারঘাট কাস্টমস স্টেশন জামে মসজিদ সংলগ্ন এলাকা থেকে ৬ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ১ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাবের অভিযানে ফেনী জেলার ফেনী মডেল থানা এলাকায় গত ২২ অক্টোবর ৭৯২ বোতল ফেন্সিডিলসহ ২ জন আসামি গ্রেপ্তারের অভিযান অন্যতম।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর হোটেল পিকক লি. বার এর কর্মচারীদের বসবাসের চতুর্থ তলার শোয়ার রুম থেকে বিভিন্ন ধরনের ২ হাজার ৪৯৬ ক্যান বিদেশি বিয়ার, ১ হাজার ৪১৬ ক্যান দেশী বিয়ার, ১১৫ বোতল বিদেশী মদ এবং ১ হাজার ৪২৮ বোতল দেশী মদসহ ৪ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ১৭ অক্টোবর বান্দরবান পৌরসভা এলাকায় র‌্যাব-৭ এর অভিযানে ৩.৭ কেজি আফিম উদ্ধার অভিযান অন্যতম।

রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে বর্তমান সময়ের আলোচিত মাদক ম্যাজিক মাশরুমের ৫টি বারে ১২০টি আইস এবং ২ বোতল বিদেশী মদসহ ২ জন যুবককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। প্রতিটি বারে ম্যাজিক মাশরুম এর পরিমান ২ হজার ৫০০ এমজি।

এছাড়াও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে অবৈধ মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) মাদকের সবচেয়ে বড় চালান ৫ কেজি আইস, বিদেশী অস্ত্র ও গুলিসহ টেকনাফ আইস সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হোছেন ওরফে খোকন ও তার ১ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

এবিষয়ে র‍্যাবের মিডিয়া উইংয়ের সহকারী পরিচালক (এএসপি) আনম ইমরান খান বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, মাদক নির্মূলে র‌্যাব সবসময় জিরো টলারেন্স জোরদারসহ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকে। মাদকের বিরুদ্ধে র‌্যাবের সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে ভয়ংকর মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) সবচেয়ে বড় চালান উদ্বার করা হয়।

এতো কিছুর পরেও দেশে কিভাবে মাদক আসে ও মাদক কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না জানতে চাইলে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যা কাজ করছে। র‌্যাবের কমসংখ্যক সদস্য নিয়েও মাদক নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে। তবে এসব আসামিরা বিভিন্ন সময় জামিনে নিয়ে আবারো একই কাজ করে থাকে।

মানসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশের ফলে আমাদের তরুণ সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী। তার মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনসহ রাজধানীতে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের সঙ্গেই মাদকের সম্পর্ক রয়েছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023