রোজীর খপ্পরে পড়ে ফতুর বহু পরিবার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় শনিবার, ২ অক্টোবর, ২০২১

ডেস্ক রিপোর্ট

উম্মে ফাতেমা রোজী। অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী। নিজেকে পরিচয় দেন অস্ট্রেলিয়ান ইমিগ্রেশনের কনস্যুলার জেনারেল হিসেবে। এ পরিচয়েই মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়েন। এরপর ‘রিলেটিভ স্পন্সরে’ লোকজনকে অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার প্রস্তাব দেন। লাখ লাখ টাকা নিয়ে ধরিয়ে দেন অস্ট্রেলিয়ার জাল ভিসা আর বিমানের জাল টিকিট।

রোজীর ফাঁদে পড়ে ফতুর হয়েছে বহু পরিবার। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি রোজীর চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর তার প্রতারণার তথ্য বেরিয়ে আসে।

সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি খিলগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রটির সন্ধান মেলে। রোজীর নেতৃত্বে চক্রটি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিত। টাকা নেওয়ার পর এরা ভিসা প্রসেসিং সেন্টার-গ্লোবাল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের (ভিএফএস) নামে ভুয়া ই-মেইল খুলে প্রার্থীকে ই-মেইল ও কর্মকর্তা সেজে ফোন দিত। তাদের হাতে জাল ভিসা, জাল বিমান টিকিট ও ভুয়া স্বাস্থ্যকার্ড ধরিয়ে দিত।

সিআইডির ঢাকা-মেট্রো পূর্ব বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার কানিজ ফাতেমা বলেন, রোজীর প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের নথিগুলো যাচাই-বাচাই চলছে। ওই চক্রের গ্রেপ্তার দু’জন যেসব তথ্য দিয়েছে, তাও যাচাই চলছে। জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, মূল আসামি বিদেশে রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সব তথ্য বিশ্নেষণ করে তাকে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রোজীর খপ্পরে পড়ে ৭৫ লাখ টাকা খুইয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এ বি এম খাইরুল ইসলামের পরিবার। তিনি  বলেন, রোজীর সঙ্গে তার এক সহকর্মী আইনজীবীর অফিসে পরিচয় হয়। তখন তিনি নিজেকে অস্ট্রেলিয়ান ইমিগ্রেশনের কনস্যুলার জেনারেল হিসেবে পরিচয় দেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক নেওয়াসহ নানা ডকুমেন্টস দেখান। একপর্যায়ে তাদের পুরো পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন ওই নারী। তার স্ত্রীকে বোন ডাকতে শুরু করেন। এভাবে তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে এক সময় জানান, তিনি রিলেটিভ স্পন্সর পেয়েছেন। বেশ কয়েকজনকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে পারবেন। তখন রোজী অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করায় তার মা ফরিদা ইয়াসমিন যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন।

প্রতারণার শিকার ওই আইনজীবী আরও বলেন, মা-মেয়ের ফাঁদে পড়ে তিনি ও তার স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ৯ জন অস্ট্রেলিয়ায় যেতে রোজীর মায়ের হাতে ৭৫ লাখ টাকা তুলে দেন। সে অনুযায়ী তাদের ভিসা, স্বাস্থ্যকার্ড, বিমান টিকিটও দেওয়া হয়। পরে তারা এগুলো যাচাই করে দেখেন সবাই ভুয়া। দীর্ঘ বছরের সম্পর্কের কারণে বুঝতেই পারেননি যে, তারা এত বড় প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উম্মে ফাতেমা রোজীর বিরুদ্ধে মানব পাচারের বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ২০১৬ সালে রমনা থানায় একটি, ২০১৭ সালে পল্টন থানায় একটি, ২০১৯ সালে একই থানায় আরেকটি এবং ২০১৭ সালে আদালতেও তার বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এসব মামলায় ওই প্রতারকের পাসপোর্টটি জব্দ করা হলেও তিনি তা ভুল তথ্য দিয়ে তুলে নিয়ে পালিয়েছেন।

রোজীর জব্দ করা পাসপোর্টটি পেতে তার হয়ে আদালতে আবেদন করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাসপোর্টটি পেতে প্রথমে নিম্ন আদালতে আবেদন করা হয়। সেটি খারিজ হলে তিনি উচ্চ আদালতেও আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটিও খারিজ হয়ে যায়। এর পরও ওই আসামি কীভাবে পাসপোর্টটি পেলেন এবং পালিয়ে গেলেন, তা জানা নেই।

সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, রোজীর হয়ে দেশে তার মা ও ভাই লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করত। তবে জাল ভিসা ও অন্যান্য জাল কাগজ তৈরি করতেন সাইমুন ইসলাম ও আশফাকুজ্জামান খন্দকার নামের দুই ব্যক্তি। সম্প্রতি তাদের গ্রেপ্তার করা হলে তারা প্রতারণার বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তি দেন।

রোজীর প্রতারণার শিকার হয়ে ১৮ লাখ টাকা খুইয়েছেন চলচ্চিত্র প্রযোজক বিপ্লব শরীফ। তিনি বলেন, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়া যেতে তিনি রোজীকে ১৮ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। রোজীর মা, ভাইসহ পুরো পরিবারটিই প্রতারক। এই চক্রের খপ্পরে পড়ে বহু লোক ফতুর হয়েছেন।

জাহিদা ভূঁইয়া নামের এক নারী জানান, উম্মে ফাতেমা রোজী তার দুই ছেলেকে পড়ালেখার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার কথা বলে ২০১৫ সালে ছয় লাখ টাকা নিয়েছিল। তিনি প্রথম দিকে বুঝতে পারেন, প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর আর টাকা দেননি। তার জানামতে, অনেকেই রোজীর প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কিন্তু লোকলজ্জায় কেউই মামলা করেননি।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023