স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের মধ্যেই কঠোর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হচ্ছে। কাল বুধবার থেকে অফিস-আদালত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শপিংমল, দোকানপাট, গণপরিবহন, লঞ্চ, ট্রেন- সব চালু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। গণপরিবহন চালানোর নির্দেশনা নিয়ে সরকারের অভ্যন্তরেই সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, উচ্চ সংক্রমণের মধ্যে সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিজ্ঞানসম্মত নয়। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তখন সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে।
গত রোববার বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর পর আসনের সমসংখ্যক যাত্রী নিয়ে অর্ধেক গণপরিবহন চলবে- এ শর্তটি নিয়ে সরকারের মধ্যেই সমালোচনা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। গতকাল সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের মন্ত্রণালয়ের। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটু আলোচনা করে নিলে ভালো হতো। কারণ অর্ধেক গাড়ি চলবে, আর অর্ধেক চলবে না- এর নিশ্চয়তা কে দেবে? আগে আলাপ করলে আমরা মতামত দিতাম। বিষয়টি এখন জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। তারা যদি সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, ভালো কথা।’
সরকারি প্রজ্ঞাপনের সমালোচনা করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘অর্ধেক গণপরিবহন বাছাই করার মতো একটি জটিল প্রক্রিয়া বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এক মালিকের কয়টি গাড়ি আছে বা কতটা গাড়ি চালাচ্ছে- দেশব্যাপী এ বিষয়টি নির্ণয় করা একদিকে যেমন কঠিন হবে, অন্যদিকে শ্রমিকরা বেকার থাকবে এবং তাদের কষ্ট লাঘব হবে না। একই সঙ্গে অর্ধেক গাড়ি চলাচলের ফলে পরিবহন সংকট দেখা দেবে এবং যাত্রীর চাপ বাড়বে। এতে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাবে।
গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের অর্ধেক বাস চালানোর ব্যাখ্যা দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। তিনি বলেন, অন্তত কিছুদিন জেলা পর্যায়ে ডিসি, এসপি, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বসে যত বাস আছে, তার অর্ধেক চালাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে বাইরে থেকে চাপ কম হয়; একসঙ্গে বেশি গাড়ি ঢাকা ও চট্টগ্রামে ঢুকতে না পারে।
এ সিদ্ধান্ত কেবল আন্তঃজেলার জন্য কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, এটি স্থানীয় প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক স্থানীয় প্রশাসন এটি ঠিক করবে। ডিসি, এসপি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মালিক-শ্রমিকরা বসে পদ্ধতি বের করবেন।
কাল সব খুলছে :করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে সাত দিনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ধাপে ধাপে তা বাড়ে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ১৫ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হয়। ঈদের পর ২৩ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আবার ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধ শুরু হয়। ৫ আগস্ট থেকে তা আরও পাঁচ দিন বাড়িয়ে ১০ আগস্ট পর্যন্ত করা হয়। কাল থেকে কঠোর বিধিনিষেধ তুলে সবকিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা থাকবে। সড়ক, রেল ও নৌপথে আসনের সমসংখ্যক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন বা যানবাহন চলাচল করতে পারবে। সড়ক পথে গণপরিবহন চলাচলের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন (সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক) নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সংশ্নিষ্ট দপ্তর বা সংস্থা, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিদিন মোট পরিবহনসংখ্যার অর্ধেক চালু করতে পারবেন। এ ছাড়া শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখা যাবে। সব শিল্পকারখানা চালু থাকবে। আর খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় অর্ধেক আসন খালি রেখে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা যাবে। আদালতের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সব ক্ষেত্রে মাস্ক পরিধান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। গণপরিবহন, বিভিন্ন দপ্তর, মার্কেট, বাজারসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে অবহেলা দেখা গেলে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব বহন করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘শর্ত শিথিলের আগে আরও ভাবুন’ :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, উচ্চ সংক্রমণের মধ্যে সবকিছু খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। এতে সংক্রমণ আরও বাড়বে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি টিকাকরণ, অপরটি সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। দেশে দ্রুততম সময়ে টিকাকরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ যে পরিমাণ টিকা আসছে তা দিয়ে সব মানুষের টিকা নিশ্চিত করতে দেড় থেকে দুই বছর লাগবে। এর আগে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ওপরেই অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে যে পরামর্শ দিয়েছিল, তাও আমলে নেওয়া হয়নি। এর পরও সরকারের প্রতি আহ্বান- বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার আগে আরও ভাবুন।
বাংলাদেশ কমো মডেলিং গ্রুপের আওতায় এক দল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ করোনা সংক্রমণের পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করছেন। এ দলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক এবং বিদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যুক্ত রয়েছেন। কমো মডেলিং গ্রুপের আওতায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত এ দলে যুক্ত আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন। তিনি সমকালকে বলেন, লকডাউন কিংবা বিধিনিষেধ নিয়ে দেশে সাপলুডু খেলা চলছে। যে প্রক্রিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আবার যখন ইচ্ছা হলে বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নামলে লকডাউন তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা এ হার নির্ধারণ করেছেন ১০ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে শনাক্তের হার ২৫ শতাংশের ঘরে থাকছে। এক সপ্তাহ এটি ৩০ শতাংশে উঠেছিল। এর মধ্যে আবারও বিধিনিষেধ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। এর ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে। কারণ ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট অধিক সংক্রমণপ্রবণ। পার্শ্ববর্তী ভারতে বিস্তার ঘটিয়ে দেশটি বিপর্যস্ত করেছে। বিশ্বের যেসব দেশে এই ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে, সব দেশ রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়।