মাইন্ড এইড বন্ধ, তবে অভিযোগের মুখে আরও

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২০

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা

একজন পুলিশ কর্মকর্তা নির্যাতনে মারা যাওয়ার পর ঢাকার আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতাল বন্ধ করা হলেও একই অভিযোগ রয়েছে এই ধরনের অনেক নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধেই।

 

মাইন্ড এইডের ঘটনাটি আলোচনায় ওঠার পর বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এবং মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কয়েকজনের কাছে অভিজ্ঞতা শুনতে চাইলে তারা মারধরের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরমধ্যে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি।

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসেবে সারাদেশে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা সরকারি চারটিসহ মোট ৩৫৫টি। এরমধ্যে ১৫৫টি ঢাকায়।

 

অনেক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র একইসঙ্গে মানসিক রোগীদের চিকিৎসাও দেয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে বৈধ মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫টি।

 

আদাবর থানার পাশের মাইন্ড এইড হাসপাতালটি মানসিক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র হিসেবেও কাজ চালাচ্ছিল, যদিও তাদের হাসপাতালের অনুমোদনই ছিল না।

 

গত ৯ নভেম্বর মাইন্ড এইড হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মারা যান এএসপি আনিসুল করিম।

 

ঘটনার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আনিসুলকে ৬ থেকে ৭ জন মাটিতে ফেলে চেপে ধরে আছেন, দুজন তকে কনুই দিয়ে আঘাত করছেন।

 

মাইন্ড এইড হাসপাতালের অন্দরে যা দেখা গেল

 

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র কিংবা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, এমন কয়েকজন আনিসুল করিমের মতো ভর্তির দিন থেকেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানান।

 

ঢাকার একটি বেসরকারি মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে নার্সের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন এক নারী।

 

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ওই নারী বলেন, দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর পোস্ট পার্টাম সাইকোসিসে (সন্তান জন্মের আগে বা পরের মানসিক সমস্যা) আক্রান্ত হয়ে ওই হাসপাতালে টানা ১০ দিন চিকিৎসা নেন তিনি।

 

হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়ে তার কোনো অভিযোগ না থাকলেও সেখানকার নার্সের হাত মার খেয়েছিলেন তিনি।

 

ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, “দ্বিতীয় সন্তান জন্মের ১৫/২০ দিন পরের ঘটনা…সেলাইয়ের ব্যথা যায়নি, কিন্তু ওর কথা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আমার শুধু মনে ছিল প্রথম বাচ্চার কথা। হাসপাতালে অবাক হয়ে ভাবতাম আমার সেই বাচ্চাটা কোথায়?

 

“রাত জেগে জেগে এই ঘর ওই ঘর খুঁজতাম। কোথায় আছি, কেন আছি কিচ্ছু বুঝতে পারতাম না। রাতে হাসপাতালের সব লাইট নেভানো থাকলেও নার্সের ঘরে আলো জ্বলত। আমি বারবার ঘুরে ঘুরে ওই ঘরে চলে যেতাম, আমার বাচ্চাটাকে খুঁজতে। তখনই বিরক্ত হয়ে একদিন গায়ে হাত তুলেছিল নার্স।

 

“গালে কালশিটে দাগ ছিল ছাড়া পাওয়ার পরেও। হাসপাতালে প্রথম দিন থেকেই ইনজেকশন দিতে চাইতাম না, হাত পা ছুড়তাম, তখন জোর করে চেপে ধরত নিয়মিতই, সেটাকে মার হিসেবে মনে রাখিনি। কিন্তু ওই ঘটনা মনে রেখেছি, পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে না পারলেও অপমানটা ঠিকই আঘাত করেছে।”

 

মানসিক রোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন বলে শান্ত করার পথ হিসেবে দৈহিক নির্যাতনকে বেছে নেওয়ার বিষয়টি প্রচলিত ছিল, যদিও এখন চিকিৎসকরা বলছেন, কোনোভাবেই শারীরিক নির্যাতন চালানো যাবে না।

 

মাদকাসক্তদের আচরণ অনেক সময় উগ্র হয়ে ওঠে বলে তাদের উপর শারীরিক নির্যাতনই বেশি নেমে আসে।

 

ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক তরুণ মিরপুরের একটি মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন দুই মাস আগে। তার ভাষ্য, চিকিৎসা সঠিক না দিলেও মারধর নিয়মিতই চলত।

 

“ডাক্তার দেখাত এক মাস-দেড় মাস পরে। খাওয়া-দাওয়া খারাপ ছিল না। কিন্তু কেউ একটু উল্টাপাল্টা করলেই স্টাফরা মারধর করতো, চড়-থাপ্পড় মারত। হাতের কাছে যাই থাকত তাই দিয়ে মারত। খাটের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখত।”

 

রাজধানীর উত্তরার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়া রনি নামে এক তরুণও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান।

 

“কী আর চিকিৎসা। থাকা খাওয়া, নানা কাজকর্ম। আর ভুলটুল হলে মারধর করত। লাঠিসহ সামনে যা পায় তাই দিয়া মারে।”

 

হাসান আরিফ নামে একজন অভিযোগ করেন, আদাবরের নিউ লাইফ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তাকে পেটানো হয়েছিল।

 

“পায়ের তলায়, হাতে মেরেছে। আমার একটা চোখ কালো হয়ে গিয়েছিল। তারা আমার মাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে দিত না। মায়ের ধারণা ছিল আমার চিকিৎসা চলছে। মা যেদিন আসতেন, তার আগের দিন আমাকে কড়া ঘুমের ওষুধ দিত। যেন আমি মায়ের কাছে গেলে ঘুমের ঘোরে থাকি।”

 

ওই নিরাময় কেন্দ্রটি মাদক বিক্রেতাদের আশ্রয়স্থল ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

“আমি বের হয়ে র‌্যাব-২ কে এসব ঘটনা জানিয়েছি। তারা তদন্ত করে সেখানে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করেছে।”

 

এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিউ লাইফ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক আহমেদুল শরীফ বলেন, “অনেক রোগী এসব মনগড়া কথা বলেন।

 

“আমাদের এখানে এ ধরনের কোনো ঘটনা নাই। যারা বলেছে তারা ঠিক বলেনি। এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।”

 

আরেকজন মাদকাসক্ত জানান, এ পর্যন্ত তিনি তিনটা পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন, এরমধ্যে দুটি কেন্দ্রেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

 

পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার ওই মাদকাসক্ত বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বজনরা না জানিয়েই পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। এটা মাদকাসক্তরা মানতে পারে না। সেজন্য থাকতে চায় না, আর তখনই নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন।

 

“আমার ওপর দিয়েও এমন ঝড় গেছে। গামছা দিয়ে আগে মুখ পেঁচায়। সেখানে কন্টিনিউয়াসলি পানি দিতে থাকে। সঙ্গে হাত-পা বাঁধে, সেখানে লাঠি দিয়ে মারে।”

 

“এটা কোন ধরনের ট্রিটমেন্ট আমার জানা নাই,” বলেন তিনি।

 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মানসম্মত কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। কয়েকটির অবস্থা ‘খুবই খারাপ’।

 

মাদকাসক্তির চিকিৎসার সঙ্গে মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে বলেও তার অভিমত।

 

“কেউ ডাক্তার ছাড়াই চিকিৎসা করায়, কেউ বাগান করায়, কেউ নামাজ পড়িয়ে চিকিৎসা করায়। যে যার মতো করছে।”

 

এজন্য এগুলোকে একটি নিয়মের মধ্যে আনা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।

 

মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের নেটওয়ার্কের (সংযোগ) সভাপতি ইকবাল মাসুদ কেন্দ্রগুলোর একটি বড় গলদ তুলে ধরেন।

 

তিনি বলেন, “পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর একটা বড় অংশ পরিচালনা করেন আগে মাদকাসক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তিরা। এ ধরনের রোগীকে কীভাবে চিকিৎসা দিতে হয় সে বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই তাদের। তারা চিকিৎসা নেওয়ার সময় যা দেখেছে, তাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করছে। সেটা সঠিক হোক বা ত্রুটিপূর্ণ হোক।”

 

এই ধরনের কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।

 

“এ ধরনের কিছু প্রতিষ্ঠানের কারণে বদনামের ভাগিদার আমরাও হচ্ছি। এ কারণে আমরাও চাই বিষয়টা সামনে আসুক। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।”

 

এ বিষয়ে সচেতন করতে সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান মাসুদ।

 

কিছু মাদকাসক্তি ও মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসানও।

 

তিনি  বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আগে মাদকাসক্ত ছিলেন এমন ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত পুনর্বাসন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পান তারা।

 

কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন- জানতে চাইলে মেহেদী হাসান বলেন, “মারধর করা ট্রিটমেন্টের অংশ নয়। এটা আইন বহির্ভূত কাজ। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোয় আমরা প্রতি মাসে অন্তত একবার ভিজিট করি। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পেলে আমরা তা বন্ধ করে দিই।”

 

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মাইন্ড এইড হাসপাতালের ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে ঢাকায় তিনটি নিরাময় কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে ২৩ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর
All rights reserved www.mzamin.news Copyright © 2023