লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটসহ রংপুর অঞ্চলে গত ১৫ দিন ধরে আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। আরো ১৫ থেকে ২০ দিন এ ধান কাটা চলবে। গত বছরের তুলনায় এবার বিঘা প্রতি ১ থেকে ২ মণ ধান কম উৎপাদন হয়েছে। তবে ফলন একটু কম হলেও আশানুরূপ দাম পেয়ে খুশি ধান চাষীরা।
কৃষকরা জানান, এ বছর অতিবৃষ্টি ও বাজারে নিম্নমানের বীজের কারণে আমন ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণ ছিল বেশি। তাদেরকে কীটনাশক ওষুধে ব্যয় করতে হয়েছে অনেক টাকা। ফলনও কমেছে গেল বছরের তুলনায়। গত বছর প্রতিবিঘা জমিতে ১০-১১ মণ ধান পেয়েছিলেন কিন্তু এ বছর পাচ্ছেন ৯ থেকে ১০ মণ।
কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, রংপুর অঞ্চলে বিগত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে এবার চলতি ২০২০-২১ মৌসুমে। এবার আবাদ হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ ৬৩ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রা ৫৯ হাজার ৬৭৫ হেক্টরের চেয়ে ৪ হাজার ১৫ হেক্টর বেশি অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি।
২০০০-০১ মৌসুমে এ অঞ্চলে আউশ আবাদ হয়েছিল ২৫ হাজার ৭৩৪ হেক্টর জমিতে, এর পরবর্তী বছরগুলোতে ক্রমাগত আউশ আবাদের এলাকা কমতে থাকে এবং ২০০৯-১০ সালে সর্বনিম্ন ১২ হাজার ৯৩৮ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়। ২০০৯-২০১০ সালের আউশ আবাদের তুলনায় এবার আবাদ হয়েছে প্রায় ৫ গুণ বেশি।
আউশ আবাদের এলাকা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে হেক্টর প্রতি গড় ফলন। ২০১৭-১৮ মৌসুমে হেক্টর প্রতি চাল উৎপাদন হয়েছিল ২.৯৮ মেট্রিক টন, গত ২০১৮-১৯ মৌসুমে তা বেড়ে হয়েছে হেক্টর প্রতি ৩.০৪ মেট্রিক টন। এ বছর হেক্টর প্রতি উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৩.০৭ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হলে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা থেকে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন চাল চলতি আউশ মৌসুমে উৎপাদিত হবে, যা মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ হাজার ৫৯ মেট্রিক টন বেশি।
কৃষি বিভাগের দাবি, চলতি মৌসুমে ২২ হাজার ৫০০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মাঝে প্রণোদনা হিসেবে প্রত্যেক কৃষককে এক বিঘা জমির জন্য ৫ কেজি উফশী জাতের আউশ বীজ, ২০ কেজি ডিএপি ও ১০ কেজি এমওপি সার বিতরণ করা হয়েছে। ২৪ হাজার ৮০ জন কৃষককে ৫ কেজি করে বীজ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ব্রি ও বিনা থেকে ১ হাজার ৯০০ কেজি বীজ সংগ্রহ করে বিনামূল্যে ৩৮০ জন কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে বৃষ্টির পানিকে কাজে লাগিয়ে আউশ আবাদকে জনপ্রিয়করণের জন্য বর্তমান সরকারের নানান পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে আউশ আবাদ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রংপুর অঞ্চলে রবি ফসল আবাদের পরে পরবর্তী রোপা আমন আবাদের আগে মে মাস থেকে মধ্য আগস্ট পর্যন্ত সময়ে পানি সাশ্রয়ী বৃষ্টিনির্ভর আউশ আবাদ করা যায়। বিগত কয়েক বছরে সরকারি প্রণোদনায় বিনামূল্যে আউশ ধানের বীজ ও সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা, উচ্চ ফলনশীল জাতের আউশ ধানের বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়া এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষক উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিং এর ফলে সেচ সাশ্রয়ী আউশের আবাদে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। যথাসময়ে কৃষি উপকরণ বিতরণ করায় আবাদের উপর তার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এবং এতে কাঙ্খিত ফলন ও উৎপাদন পাওয়া গেছে।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিণ গড্ডিমারী গ্রামের কৃষক আকতার হোসেন বলেন, ‘গত বছর তিনি ৩ বিঘা জমি থেকে আমন ধান পেয়েছিলেন ৩২ মণ। কিন্তু এ বছর পেয়েছেন ২৬ মণ। গেল বছরের তুলনায় ফলন কিছুটা কম হলেও আশানুরূপ দাম পেয়ে তিনি বেশ খুশি। তবে নিচু জমিতে আমন ধানের ফলন আরো কম হতে পারে বলে আশঙ্কা তার।’
কালীগঞ্জ উপজেলার চলবালা এলাকার কৃষক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উচুঁ জমির ধান কাটছেন কিন্তু নিচু জমির ধান কাটতে আরো সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতে হবে। এ বছর অতিবৃষ্টি আর নিম্নমান বীজের কারণে ফলনে কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তবে বাজারে প্রতিমণ ধান ১,০০০ থেকে ১,০৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে পেরে খুব খুশি তিনি।’
লালমনিরহাট কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, ‘এ বছর লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় আমন আবাদ হয়েছে ৮৫,৫৭৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন ধান। জেলায় এ পযর্ন্ত ৩০ শতাংশ জমির আমন ধান কাটা হয়েছে। তবে এখনও তারা ফলনের ঘাটতি পাননি। অতিবৃষ্টির কারণে নিচু জমির আমন ধানের ফলন কিছুটা কম হতে পারে।’
কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) কৃষিবিদ মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এ অঞ্চলে জমির প্রায় অর্ধেক ‘বোরো-পতিত-রোপা আমন’ শস্যবিন্যাসের আওতায় রয়েছে। এই শস্য বিন্যাসের মধ্যে আউশ উপযোগী জমিকে আউশভিত্তিক তিন ফসলী জমিতে নিয়ে আসার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে মাঠ পর্যায়ে। এর ফলে আউশের আবাদ বৃদ্ধির সাথে সাথে এ অঞ্চলে শষ্যের নিবিড়তা বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘উপজেলা এবং ব্লক পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে আউশ আবাদে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কৃষকদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে জমি তৈরিতে জৈব সার ও সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগ, মানসম্পন্ন আধুনিক জাতের বীজ ব্যবহার করে আদর্শ বীজতলায় চারা উৎপাদন, সঠিক বয়সের চারা সারিতে ও সঠিক দূরত্বে রোপন, চারা রোপনে লোগোবো পদ্ধতির অনুসরণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে, এবং অন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা যেন যথাযথভাবে নেয়া হয় তার জন্য কৃষকের সাথে সংযোগ অব্যাহত রয়েছে।’